তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে দেশে ফিরে নিজের লাগেজ খুলে কিছুটা বিস্মিত হন বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডে ওয়েভার। কারণ, তাঁর ব্যাগে ছিল একটি হ্যান্ডগান ও আসল গুলি। গত বুধবার আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে বিদায় উপহার হিসেবে অংশ নেওয়া প্রত্যেক নেতাকে একটি বিশেষ উপহার দেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। প্রত্যেকে পান একটি ভিনটেজ রিভলবার এবং সঙ্গে ছিল আসল গুলি, যা দেখে বোঝা যায় অস্ত্রটি শুধু প্রদর্শনীর জন্য নয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, এরদোয়ানের উদ্দেশ্য ছিল তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা তুলে ধরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশটির প্রতিরক্ষা খাত রপ্তানি ও বৈদেশিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
লিথুয়ানিয়ার প্রেসিডেন্ট গিতানাস নাউসেদার কার্যালয় প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, উপহার হিসেবে দেওয়া অস্ত্রটি সম্ভবত ‘Gumusay .357 Magnum.’ এটি তুরস্কের রাষ্ট্রায়ত্ত অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমকেই ১৯৯০-এর দশকে তৈরি করেছিল। ছয় চেম্বারের রিভলবারটি বর্তমানে বেশ বিরল।
প্রতিটি রিভলবার একটি কাঠের বাক্সে রাখা ছিল। বাক্সে তুরস্কের জাতীয় পতাকা, ন্যাটোর লোগো এবং একটি ফলক ছিল। সেখানে তুর্কি ও ইংরেজি ভাষায় লেখা ছিল, ‘গুমুসায়, আমাদের দেশে তৈরি প্রথম রিভলবার ধরনের হ্যান্ডগান।’
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের মুখপাত্র জানান, সব নেতাকে একই ধরনের রিভলবার দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি রিভলবারের ব্যারেলে সংশ্লিষ্ট নেতার নাম খোদাই করা ছিল। বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডে ওয়েভার দেশে ফিরেই তাঁর রিভলবারটি ব্রাসেলস বিমানবন্দরের পুলিশের কাছে জমা দেন, যাতে সেটি নিরাপদে সংরক্ষণ করা যায়।
পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কির এক সহকারী রেডিও আরএমএফ এফএমকে জানান, তাঁদের রিভলবারটি এখনো ওয়ারশ বিমানবন্দরে শুল্ক ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে। পরে সেটি নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করা হবে। তিনি বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই এটি দিয়ে কেউ গুলি চালাবে না।’
নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, তাঁদের রিভলবার নিজ নিজ দেশের আঙ্কারার দূতাবাসে নেওয়া হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের রিভলবারটি ব্যবহারের অযোগ্য করে ফেলা হবে, আর সুইডেনেরটি আমদানির আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের রিভলবারের সঙ্গে একটি পরিষ্কার করার কিট এবং ৫০০ গুলি দেওয়া হয়েছে বলে ডাউনিং স্ট্রিটের একটি সূত্র জানিয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির রিভলবারটি ইতিমধ্যে রোমের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পালাত্সো কিজিতে অন্যান্য রাষ্ট্রীয় উপহারের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন তাঁর রিভলবারটি একটি সামরিক জাদুঘরে দান করতে চান। অন্যদিকে গ্রিসের নেতা এটি এথেন্সের ওয়ার মিউজিয়ামে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি রসিকতা করে বলেন, ‘আমার উপহার হিসেবে দেওয়া ম্যাপল সিরাপের সঙ্গে তুরস্কের এই উপহারের কোনো তুলনাই হয় না।’ তিনি জানান, তিনি নিজে রিভলবারটি দেখেননি। এক সংবাদ সম্মেলনে কার্নি বলেন, ‘আমি কানাডার মানুষকে আশ্বস্ত করতে চাই, তারা বন্দুক আমার কাছ থেকে দূরেই রাখে।’ তাঁর ভাষ্য, রিভলবারটি ইতিমধ্যে ব্যবহারের অযোগ্য করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এটি কানাডার জাতীয় যুদ্ধ জাদুঘরে রাখা হতে পারে।
তুরস্কে বর্তমানে মূলত সেমি-অটোমেটিক পিস্তল তৈরি হয়। তাই গুমুসায় রিভলবারটি এখন সংগ্রাহকদের কাছে একটি বিরল সংগ্রহ হিসেবে বিবেচিত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তুলনামূলক কম দামের পিস্তল ও শটগান রপ্তানি করে ইউরোপের বেসামরিক আগ্নেয়াস্ত্রের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে তুরস্ক। এতে উচ্চমূল্যের ক্রীড়া ও সার্ভিস অস্ত্রের জন্য পরিচিত ইতালি ও বেলজিয়ামের পুরোনো নির্মাতাদের সঙ্গে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
জেনেভাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্মল আর্মস সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের ছোট আগ্নেয়াস্ত্র রপ্তানি করেছে তুরস্ক। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালির পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ছোট আগ্নেয়াস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ ছিল তুরস্ক।