হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

যুক্তরাজ্যে ছিলেন কোণঠাসা, কয়েক দশকে যেভাবে বদলে গেল বাংলাদেশিদের আর্থসামাজিক অবস্থা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

লন্ডনের ব্রিকলেনে বাঙালি পাড়ায় এক অনুষ্ঠানে রাজা তৃতীয় চার্লস এবং তাঁর স্ত্রী ক্যামিলা। ছবি: সংগৃহীত

১৯৮৭ সালের একদিন। পূর্ব লন্ডনের স্পিটালফিল্ডস এলাকা ঘুরে দেখছিলেন বর্তমান ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস। ১৯৪৫ সালের পর থেকে সেখানে বসতি গেড়েছিলেন অনেক বাংলাদেশি। সে সময় তাঁদের বসবাস ও কাজের পরিবেশ বিস্মিত করেছিল তৃতীয় চার্লসকে। তৎকালীন প্রিন্স অব ওয়েলস (যুবরাজ) বিস্ময় বর্ণনা করেন এভাবে, তারা যে পরিবেশে কাজ করছে, বসবাস করছে, তা ভারতীয় উপমহাদেশের অবস্থার চেয়ে কোনো অংশে ভালো নয়। বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এর মাঝে পেরিয়ে গেছে চার দশক। এখনো পূর্ব লন্ডনের বিশাল অংশ জুড়ে বাস করছে বাংলাদেশিরা, তবে তাদের জীবনযাপনের চিত্রটা আর আগের মতো নেই। পরিবর্তন এসেছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পেশাগত অবস্থানেও। যে জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে একসময় সরকারি প্রতিবেদনগুলোতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হতো, তাদের তরুণদের একটি বড় অংশ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, করছেন চাকরিও।

তবে এই পরিবর্তনের পথ ধরে ব্রিটেনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূলধারায় বাংলাদেশিরা কতটা যুক্ত হতে পেরেছেন সে নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। এ প্রশ্নের উত্তরই উঠে এসেছে দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে।

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি বাস করেন, যাদের ৯০ শতাংশের বেশি মুসলিম। তাঁদের কয়েক দশকের পথচলা একই সঙ্গে অভিবাসন, দারিদ্র্য, শিক্ষা ও প্রজন্মগত পরিবর্তনের একটি গল্প। তবে এই গল্পের শুরুটা ছিল কঠিন।

আশির দশকে ব্রিটেনে সরকারি নথিগুলোতে উঠে এসেছিল বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রার নানা সংকট। সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিশন ফর রেশিয়াল ইক্যুয়ালিটি জানায়, বাংলাদেশিরা চরম স্বাস্থ্যসংকটে ভুগছিল। তাদের কর্মসংস্থানের হারও ছিল অত্যন্ত কম।

বাংলাদেশি পোশাকে লন্ডনের রাস্তায় একটি বাঙালি পরিবার। ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষা পরিস্থিতিও ছিল হতাশাজনক। ১৯৮৫ সালে সরকারি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, স্কুলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ফলাফল ছিল ‘অত্যন্ত খারাপ’। তাদের অনেকেই বাংলাদেশে তেমন শিক্ষার সুযোগ পায়নি। ইংরেজিতেও বেশ দুর্বল ছিল তারা।

সমস্যাটা শুধু শিক্ষার সুযোগের অভাবেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বর্ণবাদের ভয়ও ছিল পরিবারগুলোর মধ্যে। বাংলাদেশি অভিভাবকেরা সন্তানদের স্থানীয় স্কুলেই পাঠাতেন। শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের হামলার আশঙ্কায় দূরের স্কুলে পাঠাতে ভয় পেতেন তাঁরা। শিক্ষকেরাও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তেমন বেশি কিছু আশা করতেন না।

এই কঠিন বাস্তবতাকে সামলে নিয়েই বেড়ে উঠছিল ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের প্রথম দিকের প্রজন্ম। তবে পরিবর্তন আসতে থাকে পরের প্রজন্মে। গল্পের মোড় ঘুরতে শুরু করে এখানেই।

সেই পরিবর্তনের ফল হিসেবে আজকের বাংলাদেশি তরুণ প্রজন্ম ব্রিটেনের স্কুলগুলো থেকে সেরা ফল নিয়ে পড়াশোনা শেষ করছেন। ১৬ বছর বয়সে ব্রিটেনে যে জিসিএসই (জেনারেল সার্টিফিকেট অব সেকেন্ডারি এডুকেশন) পরীক্ষা দিতে হয়, ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকে দেখা গেল সে পরীক্ষায় শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে টেক্কা দিতে শুরু করল বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। আর এখন তারা আরও ভালো ফল পাচ্ছে।

এরপর ২০২১ সালে দেখা যায়, জিসিএসই দেওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ৬৭ শতাংশ ১৯ বছর বয়সের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। আর শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৩৮ শতাংশ।

শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সংখ্যাই বাড়েনি, বরং পড়াশোনার বিষয় বেছে নেওয়াতেও এগিয়ে ছিল বাংলাদেশিরা। বর্তমানে বাংলাদেশি তরুণদের অধিকাংশই ভালো মানের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ছেন। ভবিষ্যতে ভালো চাকরির সুযোগ তৈরি করে এমন বিষয়ই বেছে নিচ্ছেন তাঁরা।

এমনকি গত এক দশকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয় বেছে নেওয়ার সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও দন্তচিকিৎসা বিষয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বেড়েছে তিন গুণ।

একসময় সরকারি প্রতিবেদনে যে শিক্ষার্থীদের ফলাফল ‘অত্যন্ত খারাপ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল, কয়েক দশকের ব্যবধানে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষায় শক্ত অবস্থানে চলে এসেছে।

আর এই পরিবর্তন শুধু শ্রেণিকক্ষেই থেমে নেই। পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশি পরিবারগুলোর অন্দরমহলেও। তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশি পরিবারগুলোর দারিদ্র্যের অন্যতম বড় কারণ ছিল নারীদের বড় একটি অংশের অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা। কিন্তু নতুন প্রজন্মে সেই চিত্র বদলে গেছে।

আশির দশকে লন্ডনের রাস্তায় একটি বাংলাদেশি পরিবার। ছবি: সংগৃহীত

২০২১ সালের আদমশুমারির তথ্য বলছে, ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী বাংলাদেশি নারীদের ৬৮ শতাংশ কোনো না কোনো চাকরি করছেন। শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৭৯ শতাংশ।

তবে বাংলাদেশি নারীদের সামগ্রিক কর্মসংস্থানের হার এখনো কম। এর বড় কারণ বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া অভিবাসী নারীদের কর্মসংস্থান অনেক কম। আদমশুমারিতে দেখা যায়, ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী অভিবাসী বাংলাদেশি নারীদের মাত্র ৩২ শতাংশ কর্মরত।

এই চিত্র শুধু কর্মসংস্থানের পার্থক্য নয়, প্রজন্মগত পরিবর্তনের ছবিটিও দেখা যায়। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া নারীদের তুলনায় ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি নারীরা অনেক বেশি হারে শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছেন।

তবে শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতি করলেও ভালো চাকরিতে বাংলাদেশিদের প্রতিনিধিত্ব এখনো তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম। ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিদের অবস্থা খুব একটা খারাপ না হলেও সর্বশেষ আদমশুমারিতে দেখা গেছে, ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী বাংলাদেশিদের ১৪ শতাংশ পেশাজীবী। শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ক্ষেত্রেও হারটি প্রায় একই।

পরিবর্তনের আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় শিক্ষক হিসেবে বাংলাদেশিদের সংখ্যা বাড়তে থাকায়। ২০১০-১১ সালের পর থেকে ইংল্যান্ডের স্কুলগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ হয়েছে। একসময় যেসব স্কুলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ ছিল, এখন সেই স্কুল ব্যবস্থাতেই বাংলাদেশি শিক্ষকের উপস্থিতি বেড়েছে।

তবে এই অগ্রগতির মধ্যেও পুরোনো বাস্তবতার কিছু অংশ রয়ে গেছে। ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের অনেকে আজও দরিদ্র। আবাসন ব্যয় বাদ দেওয়ার পর জাতীয় হিসাবে প্রতি দুই বাংলাদেশির একজনের আয় নিচের ২০ শতাংশের মধ্যে। একটি বাংলাদেশি পরিবারের মধ্যম সম্পদের পরিমাণ ১ লাখ পাউন্ডেরও কম। সব জাতিগোষ্ঠী মিলিয়ে এই পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ পাউন্ড।

তাহলে কি বাংলাদেশিরা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন? বসবাসের মানচিত্রের দিকে তাকালে তেমনটাই মনে হতে পারে।

এখনো পূর্ব লন্ডনেই বেশি বাংলাদেশির বসবাস। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, তাঁরা যেন একই জায়গায় আটকে আছেন। কিন্তু একই পাড়ায় বসবাস করলেও প্রজন্ম বদলের সঙ্গে বদলেছে তাঁদের জীবনযাপন, শিক্ষা ও পেশা। এর পেছনে লন্ডনে বসবাসের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ব্রিটেনের সবচেয়ে গতিশীল শহর লন্ডনে বাংলাদেশিদের বড় অংশের বসবাস তাঁদের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখছে।

এর বিপরীতে ব্রিটেনে বসবাসকারী পাকিস্তানিদের একটি বড় অংশ উত্তর ইংল্যান্ডের শিল্পোত্তর শহরগুলোতে থাকেন। তাঁরা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছেন তবে তাঁরাও শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ছাড়িয়ে গেছেন।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চের গবেষক ও থিংকট্যাংকটির সদস্য আনিসা বাট বলেন, শিক্ষিত বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি নারীরা বিয়ের বাজারে এখন বিশেষভাবে কাঙ্ক্ষিত। তাঁর ভাষায়, ‘আপনি যত বেশি যোগ্য, তত বেশি আকর্ষণীয়।’

বাংলাদেশিদের এই পরিবর্তন বুঝতে অবশ্য শুধু বর্তমানের পরিসংখ্যান দেখলে হবে না। দেখতে হবে তাঁদের অভিবাসনের ধরনটিও। কোনো জনগোষ্ঠী যখন দ্রুতগতিতে একটি দেশে অভিবাসন করে এবং এরপর নতুন অভিবাসন মোটামুটি থেমে যায়, তখন সেই জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অগ্রগতি সহজে চোখে পড়ে।

ব্রিটেনের বাংলাদেশিরা একটি আয়োজনে। ছবি: সংগৃহীত

সত্তরের দশকে পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলো থেকে নিষ্ঠুরভাবে বিতাড়িত হয়ে ব্রিটেনে যাওয়া এশীয়দের অর্থনৈতিক সাফল্য তাই যথার্থভাবেই প্রশংসিত হয়। বিশের দশকে ব্রিটেনে যাওয়া বিপুলসংখ্যক পূর্ব ইউরোপীয়ও প্রশংসার দাবিদার। এর মধ্যে পোল্যান্ডের নাগরিকদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাঁদের বেশির ভাগই শুরুতে শ্রমজীবী ছিলেন। এখন তাঁরা ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া মানুষের তুলনায় সামান্য বেশি আয় করেন।

বাংলাদেশিদের পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। তাঁদের মধ্যে যেমন নতুন অভিবাসী আছেন, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটেনে বসবাস করা মানুষও আছেন। এদের প্রায় অর্ধেক ব্রিটেনের বাইরে জন্মেছেন। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও প্রায় একই চিত্র দেখা যায়।

ফলে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীতে নতুন অভিবাসীরা নিয়মিত যুক্ত হওয়ায় সামগ্রিকভাবে তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে মূলধারায় যুক্ত হওয়ার বিষয়টি সহজে চোখে পড়ে না। একই জনগোষ্ঠীর মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছেন তুলনামূলক কম আয়ের নতুন অভিবাসী, অন্যদিকে রয়েছেন ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ও পেশাজীবী তরুণেরা।

এই দুই বাস্তবতা পাশাপাশি থাকায় বাইরে থেকে বাংলাদেশিদের আর্থসামাজিক পরিবর্তনের গতি বোঝা কঠিন। কিন্তু কয়েক দশকের ব্যবধান ধরে দেখলে পরিবর্তনটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৯৮৭ সালে স্পিটালফিল্ডস ঘুরে বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রা দেখে তৃতীয় চার্লস যে পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, আজকের বাংলাদেশি প্রজন্মের বড় একটি অংশ সেই বাস্তবতার বাইরে উঠে এসেছে। শিক্ষা ও পেশায় তাঁরা এগিয়েছেন, নারীদের কর্মসংস্থান বেড়েছে, আর নতুন প্রজন্মের একটি অংশ ব্রিটিশ সমাজের পেশাজীবী শ্রেণিতে জায়গা করে নিয়েছে।

অবশ্য দারিদ্র্য ও সম্পদের বৈষম্য এখনো রয়ে গেছে। নতুন অভিবাসনও অব্যাহত থাকায় পুরো জনগোষ্ঠীর পরিসংখ্যানে পুরোনো ও নতুন বাস্তবতা একসঙ্গে ধরা পড়ে। তাই পরিবর্তনটি একরৈখিক নয়, সবার জীবনেও সমান নয়। তারপরও কয়েক দশকের ব্যবধান একটি বিষয় স্পষ্ট করে যে ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের গল্প শুধু একটি অভিবাসী জনগোষ্ঠীর একই জায়গায় পড়ে থাকার গল্প নয়। বরং একই পাড়া, একই পরিবার এবং কখনো একই পরিবারের দুই প্রজন্মের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে বড় পরিবর্তন।

ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে তাঁদের শিক্ষা, কাজ ও সামাজিক অবস্থান। অর্থনৈতিকভাবে তাঁরা এখনো অনেক পথ পাড়ি দেবেন। কিন্তু যে জনগোষ্ঠী একসময় ব্রিটেনের মূলধারার বাইরে ছিল, তার পরবর্তী প্রজন্ম সেই মূলধারার ভেতরেই ক্রমে নিজেদের জায়গা তৈরি করে নিচ্ছে।