তুরস্কে ১৯৮০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে জার্মানি পালিয়ে যায় একটি পরিবার। সেই পরিবারেই জন্ম এলিফ এরাল্প। এখন জার্মানির রাজধানী বার্লিন শাসনের নাগালের মধ্যে চলে এসেছেন তিনি। বামপন্থী দল ডি লিংকে-কে নেতৃত্ব দিয়ে রাজধানীতে ঐতিহাসিক নির্বাচনী জয় এনে দেওয়ার পর পরবর্তী গভর্নিং মেয়র হওয়ার দৌড়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন।
৪৫ বছর বয়সী এই আইনজীবী গত রোববার অনুষ্ঠিত বার্লিনের রাজ্য নির্বাচনে অন্যতম বড় বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁর দল ডি লিংকে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে এবং এর ফলে শহরের পরবর্তী গভর্নিং মেয়র হওয়ার বিবেচনায় এসেছেন এরাল্প। তিনি নিজেকে অভিবাসী পরিবারের পটভূমি থেকে উঠে আসা একজন রাজনীতিক হিসেবে তুলে ধরেছেন। স্থানীয় রাজনীতির কেন্দ্রে তিনি আবাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে রেখেছেন।
জার্মানিতে ফিলিস্তিনপন্থী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরকারের দমন-পীড়নেরও সমালোচনা করেছেন তিনি। এরাল্প বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন এবং ইসরায়েলি সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান, জার্মানিকে অবশ্যই তাদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ করতে হবে।’
এরাল্পের বাবা-মা ছিলেন সমাজতন্ত্রী ও ট্রেড ইউনিয়নকর্মী। ১৯৮০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর নিপীড়নের আশঙ্কায় তাদের তুরস্ক ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। পরিবারটি যখন জার্মানিতে পৌঁছায়, তখন এরাল্প তাঁর মায়ের গর্ভে ছিলেন। ১৯৮১ সালে মিউনিখে এরাল্পের জন্ম হয়। পরে পরিবারটি ডর্টমুন্ড এবং এরপর হামবুর্গে চলে যায়। সেখানেই তিনি বেড়ে ওঠেন এবং আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি বিবাহিত এবং তাঁর দুই সন্তান রয়েছে।
অল্প বয়সেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এরাল্প। শিশু বয়সে তিনি একটি পরিবেশবাদী ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। পরে হামবুর্গ ও গোরলেবেনের পরমাণু অস্ত্রবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন। আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর ২০১০ সালে তিনি বার্লিনে চলে যান। সেখানে ট্রেড ইউনিয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ডি লিংকের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টারি পার্টির আইনবিষয়ক পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। সেখানে কয়েক বছর কাজ করার পর ২০১৭ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ডি লিংকে-তে যোগ দেন।
তিনি দলটিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে এমন একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা যুক্ত করেন, যে শক্তি উদারনৈতিক অর্থনৈতিক নীতির বিকল্প প্রস্তাব করবে এবং উগ্র ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডির উত্থানের মোকাবিলা করবে।
২০১৮ সালে তিনি ডি লিংকের বার্লিন কমিটিতে যোগ দেন এবং ২০২১ সালে প্রাদেশিক পার্লামেন্টে প্রবেশ করেন। পরে তিনি পার্লামেন্টারি দলের উপনেতা হন এবং গত বছর থেকে বার্লিনে দলের উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বার্লিনের আবাসন সংকটকে কেন্দ্র করে এরাল্প তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের বড় একটি অংশ গড়ে তুলেছেন। তিনি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, আরও সরকারি আবাসন নির্মাণ এবং বড় আবাসন কোম্পানিগুলোর মালিকানাধীন কিছু সম্পত্তি সরকারি মালিকানায় নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বড় সম্পত্তি কোম্পানিগুলোর প্রভাব সীমিত করা এবং বাড়তে থাকা ভাড়ার কারণে ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী সুরক্ষারও দাবি জানিয়েছেন তিনি। তিনি বার্লিনকে ‘সংহতির শহর’ হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষে কথা বলেছেন।
আবাসনের ওপর তাঁর এই গুরুত্বারোপ তাঁকে ভাড়া, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি সেবার মতো মানুষের দৈনন্দিন উদ্বেগকে কেন্দ্র করে ব্যাপকভাবে প্রচার চালানোর সুযোগ দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিউইয়র্কের প্রগতিশীল মার্কিন রাজনীতিক জোহরান মামদানি থেকেও তিনি অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। বিশেষ করে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়টিকে ভোটারদের সংগঠিত করার মতো একটি ইস্যু হিসেবে মামদানির গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তাকে প্রভাবিত করেছে।
এরাল্পের বিজয় আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ একই দিনে মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্নের পৃথক একটি রাজ্য নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থী এএফডি জয় পেয়েছে। উগ্র ডানপন্থার মোকাবিলা এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এরাল্পের রাজনৈতিক বার্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর পাশাপাশি অভিবাসী পটভূমি থেকে আসা মানুষের আরও বেশি রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণেরও তিনি দাবি জানিয়েছেন।
তবে তাঁর উত্থান জার্মানির বামপন্থী রাজনীতির অন্যতম সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যু ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনী প্রচারের সময় এরাল্প জোর দিয়ে বলেছেন, ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবশ্যই মোকাবিলা করতে হবে এবং বার্লিনের ইহুদি সম্প্রদায়ের উদ্বেগকে তিনি গুরুত্বের সঙ্গে নেন। একই সময়ে তিনি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন এবং বার্লিনের ইহুদি, মুসলিম ও ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ইচ্ছার কথা বলেছেন।
এই অবস্থান ডি লিংকের সামনে থাকা একটি বৃহত্তর চ্যালেঞ্জকে প্রতিফলিত করে। অভিবাসন, বর্ণবাদবিরোধিতা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের ওপর গুরুত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি দলটিকে ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টিও মোকাবিলা করতে হচ্ছে এবং বার্লিনের বৈচিত্র্যময় ভোটারদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য রাখার চেষ্টা করতে হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারের শুরুতে এরাল্পের উত্থান মোটেও নিশ্চিত ছিল না। কিন্তু তিনি আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং উগ্র ডানপন্থার মোকাবিলাকে তার রাজনৈতিক বার্তার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। রোববারের ফলাফল তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ডি লিংকে ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। জার্মানির পুনঃএকত্রীকরণের পর বার্লিনে এটি দলটির সর্বোচ্চ ফল এবং ২০২৩ সালে পাওয়া ১২ দশমিক ২ শতাংশ ভোটের দ্বিগুণেরও বেশি।
এদিকে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন বা সিডিইউ এবং সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এসপিডির ক্ষমতাসীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। এরাল্প বলেছেন, নতুন রাজ্য সরকার গঠনের বিষয়ে তিনি গ্রিনস ও এসপিডির সঙ্গে আলোচনা করতে চান। তবে নির্বাচনে প্রথম হওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গভর্নিং মেয়র হওয়া নয়। এই পদে যাওয়া নির্ভর করবে জোট গঠনের আলোচনা এবং দলগুলো একটি যৌথ শাসন কর্মসূচিতে একমত হতে পারে কি না, তার ওপর।
আবাসন ইস্যুটি ওই আলোচনায় সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি হতে পারে। এরাল্প বড় আবাসন কোম্পানিগুলোকে সরকারি মালিকানায় নেওয়া এবং ২০২১ সালের বার্লিন আবাসন গণভোটের ফল বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
যেকোনো নতুন সরকারকেই উল্লেখযোগ্য আর্থিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হবে। ফলে নির্বাচনী প্রচারে দেওয়া উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতিগুলোকে অন্যান্য ব্যয়ের অগ্রাধিকারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হতে পারে। ডি লিংকের ইসরায়েল ও গাজা-সংক্রান্ত অবস্থানও আরেকটি বিরোধের জায়গা হয়ে উঠতে পারে, কারণ এরাল্প ইউরোপের অন্যতম বৈচিত্র্যময় রাজধানীতে বিরোধী দল থেকে সরকারে যাওয়ার জন্য দলটিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
ফলে এরাল্পের উত্থান এখন আর শুধু তুর্কি শরণার্থীদের কন্যা হিসেবে তার সংসদে পৌঁছানোর গল্প নয়। এখন প্রশ্ন হলো, আবাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তাঁর নির্বাচনী প্রচারণাকে তিনি কীভাবে একটি কার্যকর শাসন কর্মসূচিতে রূপ দিতে পারেন এবং একই সঙ্গে সম্ভাব্য জোটসঙ্গীদের দাবিগুলোও কীভাবে সামাল দিতে পারেন।