যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে চীনের গোয়েন্দা তৎপরতায় সহায়তা করেছেন ব্রিটিশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ১০০ জনেরও বেশি শিক্ষাবিদ। এমন দাবি করেছে দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এমআইফাইভ। এ দিকে লন্ডনে চীনা দূতাবাসের একজন মুখপাত্র এই অভিযোগকে ‘কাল্পনিক ও পুরোপুরি বানোয়াট’ বলে অভিহিত করেছেন।
এমআইফাইভ সতর্কবার্তায় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাবিদদের সতর্ক করে বলেছে, চায়না জেনারেল টেকনোলজি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিজিটিআরআই) সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলে শেষ পর্যন্ত তা বিদেশি রাষ্ট্রকে সহায়তার দায়ে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
তবে এমআইফাইভ বলছে, তাঁরা বিষয়টি না জেনেই এ কাজে যুক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তারা আরও জানিয়েছে, চীনের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর হয়ে কাজ করে এমন একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গবেষকদের ব্যবহার করা হয়েছে।
ব্রিটিশ নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ড্যান জার্ভিস বলেন, এমআইফাইভের এই সতর্কবার্তা ব্রিটিশ একাডেমিক গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে চালানো চীনা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অপচেষ্টাকে উন্মোচিত করেছে।
১৪০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউনিভার্সিটিজ ইউকে জানিয়েছে, তারা এই সতর্কবার্তা পর্যালোচনা করছে। একই সঙ্গে ‘বর্তমান বা ভবিষ্যতের অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে এর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা মূল্যায়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সহায়তা’ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংগঠনটি।
গত জুনে এমআইফাইভ এবং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছিল যে চীনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পেশাজীবীদের যোগাযোগের ওয়েবসাইট ও অনলাইন চাকরির প্ল্যাটফর্মগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
চাকরির প্ল্যাটফর্ম থেকে এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
এমআইফাইভ বলছে, সিজিটিআরআই চীনের মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটির (এমএসএস) সঙ্গে ‘খুবই ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত’। এমআইফাইভের দাবি, সিজিটিআরআইয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হলো এমন একাডেমিক গবেষণায় অর্থায়ন করা, যা গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রে এমএসএসের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সরাসরি বাড়ায়।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের ১০০ জনেরও বেশি শিক্ষাবিদ ও গবেষক সিজিটিআরআইয়ের মাধ্যমে এমএসএসের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে অবদান রেখেছেন। কিছু ক্ষেত্রে এসব গবেষক তাঁদের প্রকল্পে ওই সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার বিষয়টি জানতেন না বলেও জানিয়েছে এমআইফাইভ।
এই গবেষকেরা সিজিটিআরআইয়ের অর্থায়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা, গোপন যোগাযোগব্যবস্থা এবং স্টেগানোগ্রাফি নিয়ে প্রকল্পে কাজ করেছেন। স্টেগানোগ্রাফি হলো সাধারণ কোনো বার্তা বা বস্তুর ভেতরে গোপন বার্তা বা ফাইল লুকিয়ে রাখার পদ্ধতি।
এমআইফাইভ বলেছে, ‘এই কর্মকাণ্ড মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটির গুপ্তচরবৃত্তিকে সহায়তা করে, যা যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।’
এই প্রকাশ্য সতর্কবার্তায় এমন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে যে, ব্রিটিশ গবেষকেরা দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে শেষ পর্যন্ত তাঁরা আইনের আওতায় পড়তে পারেন। এমআইফাইভ জোর দিয়ে বলেছে, রাষ্ট্রীয় গুপ্তচরবৃত্তি মোকাবিলায় ২০২৩ সালে পাস হওয়া গুরুত্বপূর্ণ আইন ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাকে সহায়তা করার নতুন একটি অপরাধের বিধান রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি কী করছেন, তা তাঁর যুক্তিসংগতভাবে জানার কথা থাকলেও তিনি তা করলে এই আইনের আওতায় পড়তে পারেন।
এ দিকে লন্ডনে চীনা দূতাবাসের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তারা ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যের কাছে ‘আনুষ্ঠানিকভাবে তীব্র আপত্তি’ জানিয়েছে। তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট চীনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থার করা অভিযোগ কাল্পনিক এবং পুরোপুরি বানোয়াট।’
মুখপাত্র আরও বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় ও চীনের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা সব সময় স্বেচ্ছামূলকভাবে এবং আইন ও বিধিবিধান মেনে পরিচালিত হয়েছে। এ ধরনের যোগাযোগ ও সহযোগিতা উভয় পক্ষের জন্যই উপকারী।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এবং চীন ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে শিক্ষাবিষয়ক যোগাযোগ ও গবেষণা সহযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত করা বন্ধ করার আহ্বান জানাই।’