ফ্রান্সজুড়ে চলমান শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশের ব্যবহৃত স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে দেশটির সরকার। বিক্ষোভ চলাকালে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত উড়ে যাওয়ার ঘটনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেছেন, গত সোমবার (৫ অক্টোবর) উত্তরাঞ্চলীয় শহর লঁসে কিশোরের হাত উড়ে যাওয়ার ঘটনার প্রকৃত কারণ স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার বন্ধ থাকবে। ঘটনাটি নিয়ে বিক্ষোভকারী ও সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, লঁসের অগুস্ত বেহাল উচ্চবিদ্যালয়ের কাছে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের সময় গ্রেনেড বিস্ফোরণে কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, কিশোরটি মাটিতে পড়ে থাকা গ্রেনেডটি তুলে নেওয়ার পর সেটি বিস্ফোরিত হয়। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একজন পুলিশ কর্মকর্তা সরাসরি তার দিকে গ্রেনেড ছুড়েছিলেন।
স্থানীয় প্রিফেক্টের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় ২০০ থেকে ২৫০ শিক্ষার্থী পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও আতশবাজি ছুড়ছিল। স্টান গ্রেনেডকে সাধারণত প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিস্ফোরণের সময় এটি ছোট রাবারের পেলেট ছুড়ে দেয়।
নুনেজ বলেন, পুলিশের আচরণ মাত্রাতিরিক্ত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইজিপিএন ১৮টি তদন্ত শুরু করেছে। তিনি বলেন, লঁসের ঘটনাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্যও প্রশ্ন তৈরি করেছে এবং ঘটনার প্রকৃত তথ্য স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত স্টান গ্রেনেড ব্যবহার স্থগিত থাকবে।
এদিকে পুলিশের একটি ইউনিয়ন সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করেছে। ইউএনএসএ পুলিশের জাতীয় সম্পাদক জ্যঁ-পল নাসিমেন্তো বলেন, আবেগের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার এই অস্ত্র না থাকলে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের আরও কাছাকাছি সংঘর্ষ হতে পারে এবং এতে আহতের সংখ্যা বাড়তে পারে।
বিক্ষোভে পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত সপ্তাহে ১৪ বছর বয়সী আরেক কিশোরের মুখে টিয়ার গ্যাসের গ্রেনেড আঘাত করলে তার কয়েকটি দাঁত পড়ে যায় এবং চোয়াল ভেঙে যায় বলে তার আইনজীবী জানিয়েছেন। এ ঘটনায় এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
এদিকে আজও ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ও অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। এ দিন পাঁচ শতাধিক স্কুল পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৪টি স্কুলে আগুন দেওয়া বা ব্যাপক ভাঙচুরের কারণে কয়েক সপ্তাহ বন্ধ রাখতে হবে, যার ফলে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়। কোথাও পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওই দিন ৪৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ও ৪৩ জন নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন।
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হওয়া এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনও যুক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ২১৫ শিক্ষার্থী, ৮৫ জন স্কুলকর্মী ও ৭১৫ পুলিশ সদস্য।
বিক্ষোভের পরিস্থিতি সামাল দিতে গতকাল রাতে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো।