হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

ফ্রান্সে স্কুলশিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ-সহিংসতার নেপথ্যে কী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

শিক্ষার মান বৃদ্ধি, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ কমানো এবং শিক্ষক সংকট দূরীকরণের দাবিতে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। ছবি: এএফপি

স্কুলশিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স। স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাসও ছুড়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে সহিংসতা। মঙ্গলবার নতুন করে বড় ধরনের বিক্ষোভের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে।

এ দিকে সরকার বলছে, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ যৌক্তিক হতে পারে, তবে সহিংসতার কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে সরকারের অভিযোগ, কট্টর বামপন্থীরা এই আন্দোলনকে উসকে দিচ্ছে। অন্যদিকে সমালোচকেরা অভিযোগ করেছেন, বিক্ষোভকারীদের দমনে কোনো কোনো পুলিশ সদস্য অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করছেন। বিক্ষোভকারীদের অনেকেই আইনগতভাবে এখনো শিশু।

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, গত সোমবার থেকে ৫ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। আর বিক্ষোভের কারণে শুক্রবার দেশটির প্রায় ৭৩৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।

এই আন্দোলনের সূত্রপাত ও পেছনের কারণগুলো খতিয়ে দেখেছে এএফপি।

যেসব অভিযোগে এ বিক্ষোভ

বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ফ্রান্সের লিসেগুলোতে। লিসে হলো সেসব স্কুলে যেখানে সাধারণত ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা তাদের স্কুলজীবনের শেষ কয়েক বছর পড়াশোনা করে। যুক্তরাষ্ট্রের হাইস্কুল এবং যুক্তরাজ্যের সিক্সথ ফর্মের সঙ্গে এর তুলনা করা যায়।

লিসের শিক্ষার্থীদের অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। তারা বলছে, স্কুলগুলোতে শিক্ষকেরা নিয়মিত উপস্থিত থাকছেন না, শ্রেণিকক্ষের পরিস্থিতি পাঠদানের উপযুক্ত নয়, ক্লাসের পরিমাণ ও সময় দুটোই বেশি। কোনো কোনো শিক্ষার্থীর মতে, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত স্কুলে থাকা অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ভ্যালেরি বেকের বলেন, ‘উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মনে করছে, তারা নিম্নমানের শিক্ষা পাচ্ছে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের এলাকার শিক্ষার্থীরা।’

আন্দোলনের সূত্রপাত যেভাবে

দুই সপ্তাহ আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রেতেইয়ের সাঁ-একজুপেরি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এই আন্দোলনের শুরু। পর্যাপ্ত শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মী এবং প্রয়োজনীয় সম্পদের অভাবের প্রতিবাদে শিক্ষকেরা ধর্মঘট করছিলেন। তাঁদের সমর্থনে বিক্ষোভে নামে শিক্ষার্থীরা।

গত এক সপ্তাহে আন্দোলনটি আরও গতি পায় এবং ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

তবে অন্যদিকে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় যখন উত্তেজনা বাড়ছিল, তখন সাঁ-একজুপেরি উচ্চবিদ্যালয়ের পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে। কর্তৃপক্ষ বিদ্যালয়টির জন্য অতিরিক্ত লোকবল পাঠাতে রাজি হওয়ায় সেখানে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। পাঠানো অতিরিক্ত কর্মীদের মধ্যে ছিলেন একজন উপপ্রধান শিক্ষক ও একজন নার্স।

আন্দোলনের শুরুতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী আবদেররহমান বলেন, ‘আমাদের ফলাফল খারাপের দিকে যাচ্ছিল। আমরা এখন আন্দোলনে না নামলে ভবিষ্যতের জন্য তা খুবই খারাপ বার্তা দিত।’ আন্দোলনের সূচনাপর্বে অংশ নিতে পেরে ‘অত্যন্ত’ গর্বিত বলেও জানায় সে।

বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে

অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে, বিশেষ করে টিকটকে বিক্ষোভের নাটকীয় ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর স্কুলশিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন আরও জোরালো হয়ে ওঠে। জ্বলন্ত ময়লার বিনের দৃশ্য কিংবা পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার ঘটনাসহ বিক্ষোভের বিভিন্ন ঘটনা শিক্ষার্থীরা মুঠোফোনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছে। অনেক চ্যানেল নিজেদের দর্শকসংখ্যা বাড়াতে এসব ভিডিও ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তগুলো জুড়ে নতুন ভিডিও তৈরি করছে।

সমাজবিজ্ঞানী বেকের বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তারা প্রচলিত গণমাধ্যমে উপস্থাপিত বর্ণনার চেয়ে ভিন্ন একটি বয়ান তুলে ধরতে পারে, এমন একটি বয়ান, যা বানানো নয়।’

সক্রিয় হয়ে উঠেছে সামাজিক বৈষম্যও

ফ্রান্সে সব শিক্ষার্থীর জন্য লিসেতে পড়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাপক বৈচিত্র্য আছে। একদিকে রয়েছে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক স্কুল, অন্যদিকে রয়েছে অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও অভিজাত প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনো শ্বেতাঙ্গ ও সচ্ছল পরিবারের সন্তানদেরই আধিপত্য দেখা যায়। এসব শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন।

সমাজবিজ্ঞানী বেকেরের মতে, বিভিন্ন শিক্ষার্থী ও স্কুলের মধ্যে স্পষ্ট বৈষম্য রয়েছে, আর এটি একটি বাস্তব সমস্যা।

রাজনৈতিক ফায়দা তোলার অভিযোগ

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে। বাকি মাত্র ছয় মাসের মতো। এ সময় এমন একটি আন্দোলন রাজনৈতিক উত্তেজনাও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকার অভিযোগ করেছে, কট্টর বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবোড (এলএফআই) এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে।

তবে এলএফআইয়ের জ্যেষ্ঠ নেতা ম্যানুয়েল বমপার সরকারের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, সরকার ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বের দিকে নেমে যাচ্ছে’।

দলটির অভিজ্ঞ নেতা ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ বিক্ষোভের প্রতি জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন। তবে তিনি সহিংসতামুক্ত পদ্ধতিতে আন্দোলন চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে বর্তমানে তাঁর সমর্থন ৪০ শতাংশের বেশি বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।

পুলিশের প্রতিক্রিয়া যেন ঘি ঢালছে আগুনে

স্কুলশিক্ষার্থীরা বিক্ষোভকালে বিভিন্ন স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ করছে, ময়লার বিন ও অন্যান্য জিনিসে আগুন দিচ্ছে এবং পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ছে। তবে পুলিশও কিছু বিক্ষোভকারীকে ছত্রভঙ্গ করতে অভিযান চালিয়েছে। এ সময় কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টার এবং রাবার বুলেট ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের লাঠিপেটা করতেও দেখা গেছে।

গত বুধবার মধ্য ফ্রান্সের তুর শহরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় আহত এক তরুণ তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন শহরটির সরকারি কৌঁসুলি।

এ দিকে পুলিশের বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গ্রেপ্তারের সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা এক কিশোরীর গলায় হাত দিয়ে ধরে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে পুলিশ সদস্যরাও বিক্ষোভকারীদের হামলার লক্ষ্য হয়েছেন। পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেলফোরের একটি স্কুলের একদল তরুণ এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ধাওয়া করে মারধর ও লাথি মেরেছে বলে জানা গেছে।