হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

শতবর্ষী নারীদের নতুন ‘ব্লু জোন’ সার্ডিনিয়ার গ্রাম বোলতানা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

বিশ্বের পাঁচটি ‘ব্লু জোন’-এর একটি সার্ডিনিয়ার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

দীর্ঘায়ুর রহস্য খুঁজতে গিয়ে ইতালির সার্ডিনিয়া দ্বীপের একটি ছোট পাহাড়ি গ্রাম নতুন করে গবেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে। গ্রামটির নাম বোলতানা। গবেষকদের মতে, এখানকার নারীদের শতবর্ষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার হার এতটাই বেশি যে, এটিকে বিশ্বের নতুন ‘ব্লু জোন’ (দীর্ঘায়ু মানুষের ঘনত্ব বেশি এমন অঞ্চল) হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, সার্ডিনিয়া ১৯৯৯ সাল থেকেই দীর্ঘায়ুর জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। দ্বীপটির মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি প্রত্যন্ত গ্রামকে বিশ্বের পাঁচটি ‘ব্লু জোনের’ একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ওই অঞ্চল থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দূরের বোলতানাতেও অসাধারণ দীর্ঘায়ুর প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে, নারীদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা অত্যন্ত স্পষ্ট।

সার্ডিনিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাসারি ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা অ্যাট বার্মিংহামের গবেষকদের যৌথ এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ফ্রন্টেইয়ার্স ইন এজিংয়ে। গবেষকেরা দেখেছেন, বোলতানার কোনো নারী ৭০ বছর বয়সে পৌঁছাতে পারলে তাঁদের ১৩ দশমিক ৮ শতাংশের ১০০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ সামগ্রিকভাবে ইতালিতে ৭০ বছর বয়সে পৌঁছানো নারীদের মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ শতবর্ষে পৌঁছান। বোলতানার নারীদের দীর্ঘায়ুর এই হার বিশ্বে হংকংয়ের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

গবেষণায় ১৯০০ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে বোলতানায় জন্ম নেওয়া মানুষের নথি বিশ্লেষণ করা হয়। এতে ৩৮ জনের বয়স ১০০ বছর ছাড়ানোর তথ্য পাওয়া যায়। গবেষকদের হিসাবে, গ্রামটির শতবর্ষী হওয়ার হার ইতালির জাতীয় গড়ের চেয়ে ৫৭ শতাংশ বেশি।

২০২৫ সালে প্রায় ২ হাজার ২৬৬ জন বাসিন্দার এই গ্রামে ১২ জন শতবর্ষী ছিলেন—যা সার্ডিনিয়ার গড়ের প্রায় ১২ গুণ। পরে তাঁদের ছয়জন মারা গেলেও অন্য ছয়জনই ছিলেন নারী। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক দুজনের বয়স ১০২ বছর। চলতি বছর ও ২০২৭ সালেও আরও কয়েকজনের শতবর্ষে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী ও ব্লু জোন ধারণার অন্যতম প্রবক্তা জিওভান্নি মারিও পেস বলেন, সার্ডিনিয়ার প্রচলিত ব্লু জোনের বাইরে ২৫ বছরের বেশি সময় পর এই প্রথম এমন একটি দীর্ঘায়ুর অঞ্চল শনাক্ত হয়েছে। তবে বোলতানার বিশেষত্ব হলো—এখানে নারীদের দীর্ঘায়ু পুরুষদের তুলনায় স্পষ্টভাবে বেশি।

পেসের মতে, নারীরা সাধারণত জৈবিক কারণেই পুরুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচেন। কিন্তু বোলতানায় নারীদের দীর্ঘায়ুর হার অধিকাংশ পশ্চিমা দেশের নারীদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।

দীর্ঘায়ুর নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে অবশ্য গবেষকেরা এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। তবে পেস শতবর্ষী নারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বজায় থাকা ‘অত্যন্ত গভীর ও বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক’-এর বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ করেছেন। ১০১ বছর বয়সী জিওভান্না মারাস যেমন তাঁর বোনের সঙ্গে থাকেন, একসঙ্গে রান্না করেন ও নিয়মিত কথা বলেন। তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো স্মৃতিভ্রংশের লক্ষণও গবেষকেরা দেখেননি।

বোলতানার মেয়র ফ্রানচেস্কো মানকোনির ধারণা, পরিচ্ছন্ন ও তাজা খাবার, দূষণমুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং দীর্ঘদিনের শারীরিক পরিশ্রম—সব মিলিয়েই এই দীর্ঘায়ুর পেছনে ভূমিকা থাকতে পারে। গ্রামের প্রবীণেরা একসময় দিনে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত হাঁটতেন বলেও জানান তিনি। তবে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘সেয়াদা’ বা ‘মুস্তাজোলুস’ তাঁরা পুরোপুরি বাদ দেননি।

ইতালিতেও শতবর্ষীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশটিতে ২৩ হাজার ৫৪৮ জনের বয়স ১০০ বছর বা তার বেশি ছিল। তাঁদের ৮২ দশমিক ৬ শতাংশই নারী। ১০৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ও ১১০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের মধ্যেও নারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।