ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতুতে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। হামলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, রাজধানীকে দুই ভাগে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করছে মস্কো—এমনটাই দাবি ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইউকের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎস্কো বলেছেন, গতকাল শনিবার সকালে পিভনিচনি (নর্দার্ন) সেতুতে হামলা চালিয়ে মস্কো ‘কিয়েভকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।’ এ হামলায় দুজন আহত হয়েছেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার পিভদেনি (সাউদার্ন) সেতুতে পাঁচবার হামলা চালানো হয়। রাশিয়া জেট ইঞ্জিনচালিত ড্রোন ব্যবহার করে কিয়েভে একের পর এক বিমান হামলা চালাচ্ছে। এসব ড্রোন ভূপাতিত করতে ইউক্রেনের বাহিনী হিমশিম খাচ্ছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেনবিরোধী অভিযানে এটি নতুন কৌশলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শীত আসার আগে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর হামলা আরও জোরদার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে মস্কো। ইউক্রেনের অন্যান্য অনেক এলাকার মতো কিয়েভও দিনিপ্রো নদীর দুই পাশে বিস্তৃত। শহরের অধিকাংশ মানুষ আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত পূর্ব অংশ থেকে কাজের জন্য পশ্চিম অংশে যাতায়াত করেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যাতে তাদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মনোবল ভেঙে যায়। সম্মুখযুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর রাশিয়া এ কৌশল নিয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
রাশিয়ার দাবি, ইউক্রেনের সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহার করা হয় বলেই তাদের ড্রোন দুটি সেতুতে হামলা চালিয়েছে। রুশ হামলায় দিনিপ্রো নদীর ওপর দিয়ে চলাচলকারী সড়ক, রেলপথ ও ট্রলিবাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে কার্যত কিয়েভ শহরটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সেতুগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলে কিয়েভের দুই পাশের যোগাযোগ চালু রাখতে ফেরি ব্যবহার কিংবা ভাসমান পন্টুন সেতু নির্মাণের বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করেছেন ইউক্রেনের কর্মকর্তারা।
রাশিয়ার জেট ইঞ্জিনচালিত ড্রোনগুলোকে কার্যকরভাবে প্রতিহত করার উপায় ইউক্রেনের হাতে নেই। যুদ্ধ শুরুর চার বছরেরও বেশি সময় পর এসব ড্রোনের ব্যবহার দেশটির বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কিয়েভে কোনো কোনো বিমান হামলার সতর্কতা ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে জারি থাকছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রাজধানীর বাসিন্দারা রসিকতা করে বলছেন, হামলার আতঙ্ক থেকে বাঁচতে তাঁরা খারকিভে ছুটি কাটাতে যেতে চান। শহরটি সম্মুখযুদ্ধের রেখা থেকে ২০ মাইলেরও কম দূরে অবস্থিত।
শুক্রবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, ‘রুশরা আমাদের দখল করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এখন তারা ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে এবং নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা আমাদের সেতু ধ্বংস করতে চায়...আমাদের ডেটা সেন্টার, ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক, হাসপাতাল, কিন্ডারগার্টেন, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়—সবকিছু ধ্বংস করতে চায়। তারা চায় মানুষ যেন নিজেদের শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়।’
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আরও জানান, রাশিয়ার জেট ইঞ্জিনচালিত ড্রোন ভূপাতিত করার জন্য পাঁচ ধরনের পরীক্ষামূলক অস্ত্রের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এসব ড্রোন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩৭৫ মাইল গতিতে চলতে পারে। এত দ্রুতগতির ড্রোনকে প্রপেলারচালিত প্রতিরোধী ড্রোন দিয়ে ধ্বংস করা সম্ভব হয় না।
জেলেনস্কির ভাষ্য, বর্তমানে কিয়েভ রাশিয়ার জেট ইঞ্জিনচালিত ড্রোনের ৫৭ শতাংশ ধ্বংস করতে পারছে। তুলনামূলকভাবে পুরোনো ধরনের ড্রোনের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৮৫ শতাংশ।
এদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি আলোচনা আবার শুরু করতে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান দুই দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ৬ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো সরকারি সফরে কিয়েভে যান।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস শনিবার জানিয়েছে, শান্তি আলোচনা এখন কয়েক শ কোটি ডলারের একটি তেল চুক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ চুক্তি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের এমন কয়েকজন ব্যবসায়ী লাভবান হতে পারেন, যাঁদের সঙ্গে উইটকফ ও কুশনারের সম্পর্ক রয়েছে। তবে দূত দুজন নিজেরা এই চুক্তি থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হবেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বর উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে বৈঠকের সময় রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন চুক্তিটির প্রস্তাব দেন। এর মাধ্যমে রুশ নাগরিকদের কাছে তিনি সম্ভবত এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসা করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি কোম্পানির মালিকানাধীন তেলক্ষেত্র, শোধনাগার ও পেট্রলপাম্প কিনে নেওয়া হলে ক্রেমলিনের সঙ্গে আস্থা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে এসব সম্পদকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতা থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে এবং জ্বালানির দাম কমতে পারে।
মার্কিন ধনকুবের টড বোহলি এ চুক্তির প্রধান সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে উঠে এসেছেন। তিনি ট্রাম্পের একজন সমর্থক এবং আগে চেলসি ফুটবল ক্লাবের মালিক ছিলেন। এ ছাড়া কাতারভিত্তিক একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীও চুক্তিতে বড় অংশীদার হতে পারে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। গোষ্ঠীটি নিয়ন্ত্রণ করেন মুতাজ আল-খাইয়াত ও তাঁর ভাই রামেজ আল-খাইয়াত। গত বছরের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে তাঁদের দুজনকেই দেখা গিয়েছিল।
উইটকফের এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘তিনি কোনো বেতন নেন না। নিজের বিমানে, নিজের খরচে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং জিম্মিদের তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।’ মুখপাত্র আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে তাঁর কোনো স্বার্থের সংঘাত নেই এবং আর্থিক কোনো অংশীদারত্বও নেই।’