ইউক্রেনে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। বুধবারের এই হামলায় শিশুসহ অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিল্পকারখানা ও জ্বালানি অবকাঠামো। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলাকে রাশিয়ার চালানো সবচেয়ে ‘জঘন্য হামলাগুলোর’ একটি বলে উল্লেখ করেছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে—সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ অঞ্চলের প্রিলুকিতে। সেখানে রাশিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্র পাঁচতলা একটি আবাসিক ভবন ধ্বংস করে। ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগ বৃহস্পতিবার সকালে টেলিগ্রামে জানায়, প্রিলুকিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২২ জনে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী কিয়েভের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে রুশ বিমান হামলার পর আরও দুটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এতে কিয়েভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে চারজনে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে, ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান ভিহিভস্কি জানিয়েছিলেন, দেশজুড়ে নিহতের সংখ্যা ২৮। এর মধ্যে প্রিলুকির হামলায় নিহত ২০ জনও রয়েছেন, যাদের মধ্যে পাঁচজন শিশু। বুধবার সন্ধ্যায় কিয়েভের প্রসিকিউটররা জানান, একটি ড্রোনের ভেঙে পড়া অংশের আঘাতে রাজধানীর একটি উপশহরে দুজন নিহত হয়েছেন।
জেলেনস্কি জানান, হামলায় পুরো দেশে প্রায় ১০০ জন আহত হয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানী কিয়েভের পাশাপাশি মধ্যাঞ্চলের ওলেক্সান্দ্রিয়া ও ক্রেমেনচুক শহরেও বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। জেলেনস্কি বলেন, রাতভর ইউক্রেনের দিকে মোট ৭০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে রাশিয়া। এর মধ্যে অনেকগুলো ছিল উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এ ছাড়া কয়েক ডজন শাহেদ ড্রোনও হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘রুশরা বেদনাদায়ক ও পরিকল্পিতভাবে নজরকাড়া হামলা চালাতে চেয়েছিল। এটি ছিল সবচেয়ে জঘন্য হামলাগুলোর একটি।’ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্মদিনের সঙ্গে হামলার সময় মিলে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে জেলেনস্কি বলেন, ‘পুতিন নিজেকে এমন জন্মদিনের উপহার দিয়েছেন: শিশুদের হত্যা, মানুষকে হত্যা।’
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা কিয়েভ ও ইউক্রেনের অন্যান্য অঞ্চলের সামরিক ও শিল্প স্থাপনায় ‘ব্যাপক হামলা’ চালিয়েছে। এতে স্থল, সমুদ্র ও আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য উচ্চনির্ভুলতার অস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়ার ছোড়া ৪৬টি জেটচালিত ড্রোনের ৮০ শতাংশের কিছু বেশি তারা ভূপাতিত করেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যেখানে ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ড্রোন ধ্বংস করছিল, সেখানে এবার এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গ্রীষ্মের পর থেকে রাশিয়া দিনরাত কিয়েভ ও ইউক্রেনের অন্যান্য শহরে হামলার জন্য নতুন ধরনের উচ্চগতির ড্রোনের ব্যবহার বাড়িয়েছে। এসব হামলা মোকাবিলা করতে ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিমশিম খাচ্ছে। তবে ড্রোন প্রতিহত করার হার হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার কারণ ইউক্রেনের বিমানবাহিনী ব্যাখ্যা করেনি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ে করা অনুরোধেরও তারা তাৎক্ষণিকভাবে জবাব দেয়নি।
জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এখনো ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ‘আমার দল এবং আমি প্রতিদিন প্যাট্রিয়ট (ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ব্যবস্থা) খুঁজছি, যেগুলো মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে এবং অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।’
বুধবার ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে নতুন করে ১২০ কোটি ইউরো বা ১৩৪ কোটি ডলার পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সের্হি কোরেতস্কি জানান, এই অর্থ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা ইউক্রেনের অস্ত্রভাণ্ডারে থাকা একমাত্র ব্যবস্থা, যা উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সক্ষম। তবে ইরান যুদ্ধ ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সরবরাহ কমে গেছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ফায়ার পয়েন্টের স্থাপনা। কিয়েভ ও কিয়েভ, চেরনিহিভ, কিরোভোহরাদ, দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক, পোলতাভা এবং খারকিভ অঞ্চলে এই কোম্পানি তাদের ফ্লামিঙ্গো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং মাঝারি ও দীর্ঘপাল্লার ড্রোন তৈরি ও সংরক্ষণ করে বলে রাশিয়া দাবি করেছে।
গত সপ্তাহে জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধে প্রথমবারের মতো নিজেদের তৈরি একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। সেটি ফায়ার পয়েন্ট তৈরি করেছে। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, শরৎকালের মধ্যে কোম্পানিটি আরও দীর্ঘপাল্লার এফপি-৯ ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত করবে বলে তিনি আশা করছেন। ফায়ার পয়েন্ট জানিয়েছে, ওই অস্ত্র মস্কো পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম হবে।