মলদোভায় বিধ্বস্ত হওয়া ‘গেরান’ নামে রাশিয়ার একটি জেটচালিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে পশ্চিমা গোয়েন্দা ও সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহৃত দ্রুতগতির এই কামিকাজে ড্রোনের প্রযুক্তিগত রহস্য উদ্ঘাটন করে তা প্রতিরোধের কার্যকর উপায় খুঁজছেন তারা।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রাশিয়া যদি এই প্রযুক্তির আরও উন্নয়ন ঘটাতে পারে, তাহলে তা ইউক্রেন যুদ্ধের গতিপথে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে এই প্রযুক্তি ইরানের হাতে ফিরে গেলে মধ্যপ্রাচ্যেও নতুন ধরনের হুমকি তৈরি হতে পারে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) বিশ্লেষক রবার্ট টোলাস্ট রাশিয়ার ‘গেরান’ ড্রোনকে এই শিল্পের ‘অসাধারণ অগ্রগতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে এটি এমন একটি মুহূর্ত, যখন একটি অস্ত্র যুদ্ধের ধরনই বদলে দিতে পারে।
ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে রাশিয়া প্রতি মাসে প্রায় ৫০০টি গেরান-৪ এবং আরও উন্নত গেরান-৫ টার্বোজেট ড্রোন তৈরি করতে পারত। বর্তমানে সেই উৎপাদন বেড়ে গত মাসে প্রায় ৩ হাজারে পৌঁছেছে।
রোববার (৪ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ন্যাশনাল’ জানিয়েছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর মলদোভায় বিধ্বস্ত ড্রোনটির ধ্বংসাবশেষ থেকে রাশিয়ার নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছেন তদন্তকারীরা। বিশেষ করে ড্রোনটি কীভাবে ঘণ্টায় প্রায় ৬০০ কিলোমিটার গতিতে উড়তে সক্ষম হচ্ছে, তা জানার চেষ্টা করা হবে।
ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা কমান্ডার ভলদিমির সেরদিউক বলেন, ড্রোনগুলো এত দ্রুতগতিতে উড়ছে যে সেগুলোকে ঠিকমতো লক্ষ্যবস্তু হিসেবে শনাক্ত করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করার সুযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে ড্রোনটির ফ্লাইট কম্পিউটার, নেভিগেশন ব্যবস্থা, প্রসেসর, অ্যানটেনা, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং ইঞ্জিন বিশ্লেষণ করা হবে। এর মাধ্যমে ড্রোনটি কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মাধ্যমে এর গতিপথ বা যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি করা সম্ভব কি না, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
ধারণা করা হচ্ছে, বিধ্বস্ত ড্রোনটি গেরান-৪। তবে এটি সর্বশেষ গেরান-৫-এর সঙ্গে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ। গেরান-৫ বেশি ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে পারে এবং এটি ইরানের নকশায় তৈরি শাহেদ-১৩৬-এর ওপর ভিত্তি করে রাশিয়ার প্রযুক্তিগত বিবর্তনের একটি নতুন ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) এক প্রতিবেদনে বলেছে, রাশিয়ার গেরান কর্মসূচির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো দ্রুত শেখা ও প্রযুক্তি পরিবর্তনের সক্ষমতা। যুদ্ধক্ষেত্রে পাওয়া অভিজ্ঞতা দ্রুত নতুন নকশায় প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উৎপাদনে পরিবর্তন আনা সম্ভব হচ্ছে।
তবে ইউক্রেনও বসে নেই। দ্রুতগতির এসব ড্রোন মোকাবিলায় দেশটি জেটচালিত ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিহতকারী ড্রোন তৈরিতে জোর দিচ্ছে।
গেরান ড্রোনগুলো প্রচলিত প্রপেলারচালিত ড্রোনের তুলনায় অনেক দ্রুত এবং বেশি উচ্চতায় উড়ছে। ইউক্রেনের সবচেয়ে দ্রুতগতির কিছু ইন্টারসেপ্টরের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৪০০ কিলোমিটার—যা নতুন গেরান ড্রোনকে ধরার জন্য যথেষ্ট নয়।
একজন ইউক্রেনীয় ড্রোন নির্মাতা বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা গতির প্রতিযোগিতায় নেমেছি।’
তবে গেরান ড্রোনের একটি দুর্বলতাও রয়েছে। এর পাল্লা প্রায় ৯৫০ কিলোমিটার হওয়ায় সীমান্তের তুলনামূলক কাছাকাছি এলাকা থেকে এটি উৎক্ষেপণ করতে হয়। ফলে উৎক্ষেপণের পর তা পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে।
ড্রোনটির প্রায় ৯০ কেজি ওজনের বিস্ফোরক বহনের সক্ষমতা রয়েছে। সেই তুলনায় রাশিয়ার একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ৪০০ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে পারে। ফলে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রগুলোর কংক্রিটের প্রতিরক্ষা ভেদ করার ক্ষেত্রে গেরানের সক্ষমতা সীমিত হতে পারে।
এর আগে ধীরগতির রুশ ও ইরানি ড্রোনগুলো শনাক্ত করার পর সেগুলো ধ্বংস করার জন্য ইউক্রেনের হাতে তুলনামূলক বেশি সময় থাকত। কিন্তু নতুন মডেলগুলোর গতি, উচ্চতা ও চালচলনের সক্ষমতার কারণে সেগুলো ভূপাতিত করার হার প্রায় ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে।
যুদ্ধবিমান দিয়ে এসব ড্রোন ধ্বংস করা সম্ভব হলেও এতে ব্যয় অনেক বেশি। কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ডলার মূল্যের ড্রোন ধ্বংস করা দীর্ঘ মেয়াদে ব্যয়বহুল। তাই কম খরচে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরিই এখন ইউক্রেনের বড় চ্যালেঞ্জ।
রাশিয়ার এই প্রযুক্তি আবার ইরানের হাতে পৌঁছালে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্যও নতুন উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
ইরানের কাছে ইতিমধ্যে টার্বোজেটচালিত শাহেদ-২৩৮ রয়েছে। সিএসআইএসের মতে, এই ড্রোন ঘণ্টায় ৩০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে উড়তে পারে এবং প্রায় ৯০ কেজি বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম।
ভবিষ্যতে ইরান জেটচালিত ড্রোনের সঙ্গে ধীরগতির শাহেদ-১৩৬ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করলে একই সময়ে একাধিক ধরনের আক্রমণের মুখে পড়তে পারে প্রতিপক্ষ।
টোলাস্টের মতে, ইরানের হাতে রুশ প্রযুক্তি পৌঁছানো এখন ‘সময়ের ব্যাপার মাত্র’। তিনি বলেন, বিভিন্ন সংঘাত থেকে পাওয়া প্রযুক্তির উপাদান উল্টো প্রকৌশলের মাধ্যমে পুনর্গঠনে ইরানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তিনি আরও সতর্ক করেছেন, ইয়েমেনের হুতিরাও যদি এই প্রযুক্তি পায়, তাহলে তারাও জেটচালিত ড্রোন তৈরি করতে পারে। হুতিরা এরই মধ্যে নিজেদের রকেট ও ড্রোন তৈরির সক্ষমতা দেখিয়েছে। সে ক্ষেত্রে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নতুন ধরনের হুমকি তৈরি হতে পারে।
টোলাস্টের পরামর্শ, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোর ইউক্রেনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে কম খরচের জেটচালিত ইন্টারসেপ্টর দ্রুত উন্নয়ন করা উচিত। একই সঙ্গে গড়ে তুলতে হবে অত্যন্ত কার্যকর একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও।