হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

ফ্রান্সজুড়ে হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, আটক ৪৪০

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ফ্রান্সের একটি শহরে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: এএফপি

ফ্রান্সজুড়ে হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ গতকাল মঙ্গলবার সহিংস রূপ নেয়। এই ঘটনার পর অন্তত ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে। আটকদের বেশিরভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। তিনি বলেন, আটক ব্যক্তিদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সংখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, শিক্ষাব্যবস্থায় অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মী সংকট, দীর্ঘ ক্লাসসূচি এবং পর্যাপ্ত সম্পদের অভাবের প্রতিবাদে এই আন্দোলন শুরু হয়। গত সপ্তাহে প্যারিসের আশপাশের আইল–দে–ফ্রাঁন্স অঞ্চলে শুরু হওয়া বিক্ষোভ মঙ্গলবার ফ্রান্সের অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ করে ক্লাস বন্ধ রাখার চেষ্টা করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, মঙ্গলবার প্রায় ৪০০টি স্কুল বিক্ষোভ বা এর কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে প্রভাবিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০টি স্কুল অবরোধ করা হয় এবং আরও ৪৪টি স্কুলে অবরোধের চেষ্টা চালানো হয়।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, অনেক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩২ থেকে ৩৫ জন পর্যন্ত। ফলে শিক্ষকেরা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে কাজ করছেন এবং শিক্ষার্থীদেরও স্বাভাবিক পরিবেশে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছু শিক্ষার্থী দীর্ঘ ক্লাসসূচি এবং অতিরিক্ত গরম শ্রেণিকক্ষ নিয়েও অভিযোগ করেছে।

গতকাল মঙ্গলবার বিভিন্ন স্থানে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ফরাসি গণমাধ্যম ও বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীরা আবর্জনার বাক্সে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশের দিকে বোতল, পাথরসহ বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারে। কিছু জায়গায় বাসস্টপ ও বিজ্ঞাপনের কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জবাবে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।

মঙ্গলবারের সংঘর্ষে অন্তত ১০ শিক্ষক ও কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। আহত হন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৪৮ জন সদস্যও। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, কিছু ঘটনায় পুলিশের দিকে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ছোড়ার ঘটনাও ঘটেছে।

১৬ বছর বয়সী এক ছাত্রী এএফপিকে বলেন, ‘আমরা একটি বার্তা দিতে এখানে এসেছি। কোনো কারণ ছাড়াই সবকিছু ভেঙেচুরে ফেলার জন্য আমরা এখানে আসিনি। আমরা বলতে চাই, শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। আমাদের প্রতিটি ক্লাসে ৩৪ জন করে শিক্ষার্থী। এভাবে চলা সম্ভব নয়। শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ রয়েছে।’

শিক্ষার্থীদের সংগঠন ইউনিয়ঁ সাঁদিকাল লিসেয়েঁ বা সেন্ট্রাল হাইস্কুল স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সভাপতি রিয়াদ রনি সরকারের বিরুদ্ধে ‘দমন-পীড়নের’ অভিযোগ করেন এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা শিক্ষা খাতে সাধারণ সম্পদের ঘাটতি, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক ও কর্মীর সংকটের প্রতিবাদ করছে।

ফরাসি শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে বলেন, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করার অধিকার রয়েছে। তবে সহিংসতার ঘটনাগুলোকে তিনি ‘কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে নিন্দা করেন। সামাজিকমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, বিক্ষোভের অধিকার একটি মৌলিক স্বাধীনতা হলেও সেটিকে সহিংস কর্মকাণ্ডের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। তাঁর ভাষায়, স্কুল অবরোধ আরও বাড়ানোর আহ্বান শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মীদের বিপদের মধ্যে ফেলতে পারে এবং এটি দায়িত্বজ্ঞানহীন।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আরও তীব্র হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। সোমবার ১৬৪ জনকে আটকের পর তিনি বলেন, স্কুলের সামনে আতশবাজি, আগুন এবং সহিংসতার মতো ঘটনা শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মী কিংবা পুলিশকে বিপদের মধ্যে ফেলার কোনো বৈধতা দিতে পারে না। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন যে উচ্চবিদ্যালয়গুলোর সমস্যাগুলো শুনে তার সমাধান করা প্রয়োজন।

বিক্ষোভের মধ্যেই মঙ্গলবার ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষক, হাসপাতালকর্মী ও সরকারি কর্মচারীদের ইউনিয়নগুলোও ধর্মঘট ও কর্মবিরতি পালন করে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে কম বেতন, কর্মপরিবেশের অবনতি এবং সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট কাটছাঁটের বিরোধিতা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের হিসাবে, এসব কর্মসূচিতে অন্তত ২ লাখ মানুষ অংশ নেন এবং বেশিরভাগ কর্মসূচিই বড় ধরনের ঘটনা ছাড়াই শেষ হয়।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং সরকারি কর্মীদের ধর্মঘট এমন সময়ে হচ্ছে, যখন ফরাসি সরকার ২০২৭ সালের বাজেট নিয়ে চাপের মধ্যে রয়েছে। সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে দেশটিতে অসন্তোষ বাড়ছে। ফলে স্কুলশিক্ষার্থীদের শিক্ষা-সংক্রান্ত দাবির সঙ্গে বৃহত্তর সরকারি কর্মী আন্দোলনও একই দিনে রাজপথে এসে মিলেছে।