পূর্ব ইউক্রেনের ক্রামাতোরস্ক শহরে যাত্রীবাহী দুটি বাসে রাশিয়ার ছোঁড়া একটি গ্লাইড বোমা সরাসরি আঘাত হানে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ হামলায় অন্তত ৩০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়েছেন। স্থানীয় আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের বরাতে এই প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছে, হামলাটি সম্পূর্ণ পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রের ফ্রন্ট লাইন থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শহরের একটি ব্যস্ত সড়কে বিমান থেকে এই গ্লাইড বোমাটি ফেলা হয়। গ্লাইড বোমাগুলো আকাশ থেকে ফেলার পর লক্ষ্যবস্তুর নির্দিষ্ট স্থানাঙ্কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গিয়ে আঘাত হানতে পারে।
হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আঞ্চলিক প্রশাসনের প্রধান ভাদিম ফিলাশকিন সামাজিক মাধ্যম টেলিগ্রামে লিখেছেন, ‘রুশ বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য বানাচ্ছে। তাদের কাছে যাত্রীতে ঠাসা একটি বাস সবচেয়ে লোভনীয় লক্ষ্যবস্তু, কারণ মাত্র একটি আঘাতেই এখানে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষকে হত্যা করা সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়া আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও যুদ্ধের সব নিয়ম জেনেশুনে লঙ্ঘন করছে। যেখানে সবচেয়ে বেশি বেসামরিক প্রাণহানি ঘটানো সম্ভব, তারা সেখানেই আঘাত হানছে।’
হামলার পরপরই রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনের সামগ্রিক পরিবহন অবকাঠামো ধ্বংসের নতুন কৌশলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ক্রামাতোরস্ক এবং প্রতিবেশী স্লোভিয়ানস্ক শহরে সব ধরনের গণপরিবহন চলাচল স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছেন ফিলাশকিন।
কিয়েভভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পেন্টা’র প্রধান ভলোদিমির ফেসেঙ্কো এই হামলাকে রাশিয়ার রণকৌশলের নতুন রূপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আগে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও হিটিং ব্যবস্থা অচল করা। কিন্তু এখন তাদের নতুন কাজ হলো দেশের পরিবহন অবকাঠামো অচল করে দিয়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মারাত্মক ধস নামানো।’
রেলপথ, বাস, মিনিবাস, পেট্রোল পাম্প, সেতু ও সমুদ্রবন্দরে অনবরত হামলা চালিয়ে ইউক্রেনীয়দের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং নিজেদের শর্তে শান্তি মেনে নিতে বাধ্য করাই মস্কোর প্রধান লক্ষ্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই ইউক্রেনে ১৫ হাজার ২৮০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত বা আহত হয়েছেন—যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৫৫ শতাংশ বেশি। যদিও শুরু থেকেই রাশিয়া সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার দায় অস্বীকার করে আসছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আক্রমণের পর থেকে আকাশপথে বেসামরিক বিমান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে ট্রেন, বাস ও ট্রাকই এখন ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ, নিত্যপণ্য সরবরাহ ও সামরিক-মানবিক সহায়তার একমাত্র অবলম্বন। রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা ‘উকরজালিজনিৎসিয়া’ জানিয়েছে, ২০২২ সাল থেকে অন্তত ৫২১টি লোকোমোটিভ ড্রোন ও গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার তিন-পঞ্চমাংশই ঘটেছে চলতি ২০২৬ সালে।
গত জানুয়ারিতে খারকিভে চলন্ত ট্রেনে হামলায় ৫ যাত্রী নিহত হন। এমনকি গত ১৪ সেপ্টেম্বর সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে বহনকারী ট্রেন পোল্যান্ড সীমান্তে প্রবেশের মাত্র ৩০ মিনিট পর পশ্চিমাঞ্চলীয় ইয়াহোদিন স্টেশনে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনের লোকোমোটিভে ড্রোন হামলা চালানো হয়।
ইউক্রেনীয় ড্রোন যুদ্ধের অগ্রদূত আন্দ্রি প্রোনিন জানান, রাশিয়ার নতুন প্রজন্মের ড্রোনগুলো এখন আর আগের মতো ধীরগতির নয়। এগুলো জেট-চালিত, অতিরিক্ত বিস্ফোরক বহনে সক্ষম এবং দূর থেকে চালক দ্বারা সরাসরি নিয়ন্ত্রিত। ‘মেশ নেটওয়ার্ক’ ব্যবহারের মাধ্যমে এক ড্রোন অন্য ড্রোনের সংকেত বাড়াতে সাহায্য করে।
কর্মকর্তারা জানান, অনেক ক্ষেত্রে টেলিগ্রামে বিপুল অর্থের লোভ দেখিয়ে ইউক্রেনীয় কিশোর ও নাগরিকদের ফাঁদে ফেলে ঘরের মোডেম চালু রাখা হয়, যা থেকে ড্রোনের সংকেত গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি পাশের দেশ বেলারুশের মোবাইল নেটওয়ার্ক ও চোরাচালানকৃত সিম কার্ডের সংকেত ব্যবহার করে ড্রোনগুলোকে ইউক্রেনের যেকোনো প্রান্তে পরিচালনা করছে রাশিয়া।
হামলার আশঙ্কায় এখন পুরো ইউক্রেনজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী কিয়েভ থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর জাপোরিজিয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত জীবন ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন। গত ৬ জুলাই এআই-চালিত ড্রোনের মাধ্যমে এক পেট্রোল পাম্পে চালানো হামলায় ১৮ বছর বয়সী তাতিয়ানা বুবিনেটস নামের এক শিক্ষার্থীসহ ৩ জন সাধারণ নাগরিক মারা যান। বাস, মিনিবাস ও ট্রেনের ওপর এই রাশিয়ান তাণ্ডবে এখন সচল অবকাঠামো টিকিয়ে রাখাই ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।