হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

ধর্মেকর্মে নেই, তারাই ব্রিটেনে খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী, বলছে গবেষণা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ব্রিটেনে এখন খ্রিষ্টধর্ম চর্চার চেয়ে দেশের খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্য রক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে থিওসের নতুন এক জরিপে উঠে এসেছে। ছবি: সংগৃহীত

ব্রিটেনে খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল থাকা গোষ্ঠীর অধিকাংশই নিজেদের খ্রিষ্টান বললেও খুব কম মানুষ নিয়মিত গির্জায় যান। তাঁদের কাছে খ্রিষ্টধর্ম চর্চার চেয়ে দেশের খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্য রক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে থিওসের নতুন এক জরিপে উঠে এসেছে।

যুক্তরাজ্যের থিংকট্যাংক থিওস খ্রিষ্টধর্ম ও ব্রিটিশ পরিচয় নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে ২০২৬ সালের এপ্রিলে ১ হাজার ৭৬৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর জরিপটি চালায়। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মনোভাবের ভিত্তিতে পাঁচটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠী চিহ্নিত করা হয়।

খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষদের গবেষকেরা ‘পরিচয়কেন্দ্রিক সমন্বয়বাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ১১ শতাংশ এ গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, যা পাঁচটি গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে কম।

পরিচয়কেন্দ্রিক সমন্বয়বাদীদের ৮১ শতাংশ নিজেদের খ্রিষ্টান হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তবে এ গোষ্ঠীর মাত্র ১৩ শতাংশ প্রতি সপ্তাহে গির্জায় যান। জরিপে অংশ নেওয়া সবার মধ্যে সাপ্তাহিক গির্জায় যাওয়ার গড় হার ১১ শতাংশ। এ গোষ্ঠীর ৩১ শতাংশ প্রতি সপ্তাহে প্রার্থনা করেন। বাইবেলের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ৪৭ শতাংশ।

অভিবাসন ও ইসলাম নিয়ে পরিচয়কেন্দ্রিক সমন্বয়বাদীদের মনোভাব ছিল প্রবল বিরূপ। এ গোষ্ঠীর মাত্র ১৯ শতাংশ মনে করেন, খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধ অনুযায়ী আশ্রয়প্রার্থীদের স্বাগত জানানো ও তাঁদের সহায়তা করা উচিত।

জনজীবনে সব ধর্মের মানুষের সমান আচরণ পাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন এ গোষ্ঠীর মাত্র ৩০ শতাংশ।

জরিপে আরেকটি গোষ্ঠীতে খ্রিষ্টান পরিচয়ের হার বেশি ছিল। ধর্মীয় অনুশীলনেও এ গোষ্ঠী তুলনামূলক সক্রিয় এবং অভিবাসন ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের প্রতি তাদের বিরূপ মনোভাব কম ছিল। অংশগ্রহণকারীদের ১৩ শতাংশ এ গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

গবেষকেরা এ গোষ্ঠীকে ‘বিশ্বাসকেন্দ্রিক সমন্বয়বাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ গোষ্ঠীর ৩১ শতাংশ প্রতি সপ্তাহে গির্জায় যান, ৪৬ শতাংশ প্রতি সপ্তাহে প্রার্থনা করেন এবং ৬২ শতাংশ বাইবেলের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

বিশ্বাসকেন্দ্রিক সমন্বয়বাদীদের ৪৮ শতাংশ মনে করেন, খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধ অনুযায়ী আশ্রয়প্রার্থীদের স্বাগত জানানো ও সহায়তা করা উচিত। জনজীবনে সব ধর্মের মানুষের সমান আচরণ পাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন ৬৩ শতাংশ।

চর্চাকারী খ্রিষ্টানদের সর্বোচ্চ অনুপাত বিশ্বাসকেন্দ্রিক সমন্বয়বাদীদের মধ্যে থাকলেও এ গোষ্ঠীর মাত্র ১৮ শতাংশ মনে করেন, খ্রিষ্টান হওয়ার জন্য ব্রিটেনের খ্রিষ্টীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। পরিচয়কেন্দ্রিক সমন্বয়বাদীদের মধ্যে এ মত পোষণ করেন ৯০ শতাংশ।

সম্প্রতি ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ সমাবেশে ক্রুশ বহন করতে দেখা গেছে। বিক্ষোভে জনতাকে ‘খ্রিষ্টই রাজা’ স্লোগান দিতেও শোনা গেছে।

এমন সময়ে গবেষণাটি ব্রিটেনে খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিকে খ্রিষ্টধর্মের পুনর্জাগরণের প্রতিফলন হিসেবে দেখার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। গবেষণার ফল ইঙ্গিত করছে, অভিবাসন, ইসলাম ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নিয়ে বৃহত্তর উদ্বেগের মধ্যে খ্রিষ্টধর্মকে ক্রমেই ব্রিটিশ পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

জরিপে অংশ নেওয়া ৫৫ শতাংশ ব্রিটিশ বলেছেন, তাঁদের এলাকার গির্জা বন্ধ করে সেখানে মসজিদ করা হলে তাঁরা অসন্তুষ্ট হবেন। এদের মধ্যে ৩৭ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা খুবই অসন্তুষ্ট হবেন।

জরিপে এক-তৃতীয়াংশের বেশি, ৩৭ শতাংশ, এমন একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্বের সঙ্গে একমত হয়েছেন, যেখানে দাবি করা হয়, মুসলিম-প্রধান দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের দিয়ে ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এ ধারণা ‘বৃহৎ প্রতিস্থাপন’ তত্ত্ব নামে পরিচিত।

থিওসের জ্যেষ্ঠ ফেলো এবং প্রতিবেদনটির অন্যতম লেখক নিক স্পেনসারের মতে, খ্রিষ্টান পরিচয়ের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত দুটি গোষ্ঠীর আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে মনোভাবের পার্থক্যের পেছনে ধর্মীয় অনুশীলন ও জাতিগত গঠনের ভূমিকা থাকতে পারে।

ধর্মীয় আচার-অনুশীলনে বেশি সক্রিয় খ্রিষ্টানদের গোষ্ঠীটি পাঁচটি গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জাতিগত বৈচিত্র্যপূর্ণ। এ গোষ্ঠীর ২০ শতাংশ নিজেদের অশ্বেতাঙ্গ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।

অন্যদিকে, পরিচয়কেন্দ্রিক সমন্বয়বাদীরা জাতিগত বৈচিত্র্যের দিক থেকে সবচেয়ে কম বৈচিত্র্যপূর্ণ গোষ্ঠীগুলোর একটি।

স্পেনসার বলেন, ‘ধারণা হিসেবে খ্রিষ্টধর্ম এবং বাস্তব জীবনে অনুশীলন করা খ্রিষ্টধর্মের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।’

স্পেনসার আরও বলেন, ‘রোববার সকালে বিছানা ছেড়ে উঠে এমন মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো যদি আপনার কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়, যাঁদের আপনি নিজে বেছে নেননি—গির্জার বেঞ্চে আপনার পাশে কে বসবেন কিংবা প্রার্থনার সময় কমিউনিয়নের রেলিংয়ের পাশে কে দাঁড়াবেন, তা আপনি ঠিক করতে পারেন না—তাহলে বিষয়টি আরও মানবিক হয়ে ওঠে, মানুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও আরও সহানুভূতিশীল হয়।’

লিডসের কার্কস্টলের চার্চ অব ইংল্যান্ডের বিশপ অরুণ অরোরা বলেন, সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসেবে খ্রিষ্টধর্মকে ধারণ করা এবং বিশ্বাসের চর্চা করার মধ্যকার পার্থক্য বোঝা এ গবেষণার ফল অনুধাবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অরোরা বলেন, ‘যিশুর শিষ্য হওয়ার অর্থ কী? এর তিনটি দিক রয়েছে: নিজেকে অস্বীকার করা, নিজের ক্রুশ তুলে নেওয়া এবং আমাকে অনুসরণ করা।’

অরোরা আরও বলেন, ‘জাতীয়তাবাদীদের ক্ষেত্রে আমার কাছে যে বিষয়টি আকর্ষণীয় মনে হয়, তা হলো তাঁরা মিছিলে ক্রুশ তুলে নিতে ও তা প্রদর্শন করতে চান। কিন্তু নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করা এবং যিশুকে অনুসরণ করার বিষয়ে তাঁদের আগ্রহ তুলনামূলক কম।’

অরোরার মতে, গির্জার নেতাদের জন্য এ গবেষণার শিক্ষা শুধু মানুষকে গির্জায় আসতে উৎসাহিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের সমাজের মানুষের কাছে যেতে হবে।

অরোরা বলেন, ‘নূহের নৌকার উপমা ব্যবহার করে যদি বলা হয়, মানুষকে রক্ষা পেতে নৌকায় উঠে আসার জন্য আমরা গির্জা হিসেবে অপেক্ষা করতে থাকব, তাহলে আমাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে।’

অরোরা আরও বলেন, ‘বরং আমাদের দায়িত্ব হলো শিষ্যত্বের পূর্ণাঙ্গ সুসমাচার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া—শিষ্য হওয়ার জন্য কী প্রয়োজন, এর জন্য কী মূল্য দিতে হয়, তা ব্যাখ্যা ও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। একই সঙ্গে নিজের মানুষ ও সমগ্র বিশ্বের প্রতি ঈশ্বরের গভীর ভালোবাসার কথা জানানো; শুধু নির্দিষ্ট ধরনের পাসপোর্টধারীদের প্রতি নয়।’

চরম ডানপন্থীদের খ্রিষ্টধর্মের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করেছেন ধর্মতত্ত্ববিদ রেভারেন্ড ড. হেলেন পেইন্টার। তিনি বলেন, গবেষণার ফল রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা নির্বিশেষে সবাইকে স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রে গির্জাগুলোর দায়িত্বের বিষয়টি তুলে ধরেছে।

পেইন্টার বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই গির্জা বহু জাতি ও বহু দেশের মানুষের সমন্বয়ে গঠিত একটি গোষ্ঠী। তাই একে যথাযথভাবে কোনো একটি জাতীয়তা বা জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। প্রকৃতপক্ষে, বর্তমান বিশ্বের একজন গড়পড়তা খ্রিষ্টান হলেন দরিদ্র, নারী ও কৃষ্ণাঙ্গ।’

পেইন্টারের মতে, গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, যাঁরা নিয়মিত খ্রিষ্টধর্মের চর্চা করেন, তাঁদের মনোভাবের সঙ্গে শুধু খ্রিষ্টান পরিচয় ধারণ করেন এমন ব্যক্তিদের মনোভাবের স্পষ্ট পার্থক্য।

পেইন্টার বলেন, ‘খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস এমন কোনো পরিচয় নয়, যা আমরা কোটের মতো গায়ে চাপিয়ে নিতে পারি। এর সঙ্গে অতীন্দ্রিয় সত্তার এক ধরনের সংযোগ জড়িয়ে আছে, যা আমাদের সব মূল্যবোধকে বদলে দিতে বাধ্য।’