হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

বছরব্যাপী ছাত্রবিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করলেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

সার্বিয়ার টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারে দেখা যায়, পার্লামেন্টের ভেতরে কালো ও গোলাপি রঙের ধোঁয়ায় ভরে গেছে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

টানা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা দুর্নীতিবিরোধী তীব্র ছাত্র আন্দোলন ও ক্রমবর্ধমান জন অসন্তোষের মুখে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ।

রাজধানী বেলগ্রেডে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের বাইরে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। ৯ বছর দেশ শাসনের কথা উল্লেখ করে ভুচিচ দাবি করেন, তাঁর প্রশাসন এই সময়ে সার্বিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

আগামী বছর তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে সার্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের তিন মাসের মধ্যে নতুন নির্বাচন আয়োজন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে চলতি বছরের শেষের দিকে সার্বিয়ার জনগণকে দুটি পৃথক নির্বাচনে ভোট দিতে হবে।

রুশপন্থী ও ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত আলেকসান্দার ভুচিচের সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠছিল। তবে ২০২৪ সালে সার্বিয়ার নোভি সাদ রেলওয়ে স্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরম রূপ নেয়।

ওই স্টেশনের সংস্কারকাজকে ভুচিচ তাঁর সরকারের অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে প্রচার করেছিলেন। ফলে সাধারণ নাগরিকেরা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাকে ভুচিচের নেতৃত্বাধীন প্রোগ্রেসিভ পার্টির এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা শাসনের দুর্নীতি ও অবহেলার ফল হিসেবে দেখেন।

এরপরই ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক ও কৃষকদের অংশগ্রহণে সার্বিয়াজুড়ে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রেসিডেন্টের বেশ কয়েকজন অনুগত কর্মকর্তা পদত্যাগ করলেও আন্দোলনকারীদের শান্ত করা যায়নি। গত গ্রীষ্মজুড়ে এই বিক্ষোভ চলে এবং পুলিশের বিরুদ্ধে দমনপীড়নের অভিযোগ ওঠায় বেশ কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

সংসদীয় নির্বাচনে নিজের দলের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা থেকে ইতিমধ্যেই গত জুনে পদত্যাগের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ভুচিচ। সার্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী তিনি টানা তিন মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না।

এর আগে বিক্ষোভকারীদের আগাম নির্বাচনের দাবির মুখে আগামী অক্টোবরের শেষের দিকে আগাম সংসদীয় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, ওই সংসদীয় নির্বাচনের এক মাসেরও বেশি সময় পর অনুষ্ঠিত হবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।

ভুচিচ স্পষ্ট করেছেন, তিনি তাঁর দল প্রোগ্রেসিভ পার্টির নেতা হিসেবে সংসদীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে পদত্যাগের পরও সার্বিয়ার রাজনীতির ক্ষমতার শীর্ষেই থেকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করছেন তিনি।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট পদত্যাগের পর নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রোগ্রেসিভ পার্টির সদস্য আনা ব্রনাবিচ।

সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে পাওয়া সাংবিধানিক ক্ষমতার বলে ভুচিচ গত দেড় বছরের আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় অভিযুক্ত ২৩ জন শিক্ষার্থী এবং দলীয় অনুগতসহ মোট ৪৯ জনকে ক্ষমা ঘোষণা করেছেন।

আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনে ভুচিচের ক্ষমতাসীন প্রোগ্রেসিভ পার্টিকে দুটি বড় রাজনৈতিক শক্তির মুখোমুখি হতে হবে—একটি হলো শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ‘স্টুডেন্টস উইন’ এবং অন্যটি হলো পশ্চিমাপন্থী বিরোধী দলগুলোর জোট ‘ইউরোপিয়ান সার্বিয়া’।

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সার্বিয়ার রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন আলেকসান্দার ভুচিচ। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে তিনি প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি প্রকাশ্যে সার্বিয়াকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগ দেওয়ার কথা বললেও, একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এবং চীনা বিনিয়োগের জন্য সার্বিয়াকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।