পশ্চিম ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন সম্পত্তিকে ‘ট্রোজান হর্সের’ মতো গোপন ঘাঁটিতে পরিণত করেছে রুশ গুপ্তচররা। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সতর্কবার্তা এমনই। তাদের আশঙ্কা, সমন্বিত নাশকতা চালানোর জন্যই এই নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। দুর্বল আইনি কাঠামোর সুযোগ নিয়ে রাশিয়ার গোপন ইউনিটগুলো অন্তত এক ডজন ইউরোপীয় দেশে সামরিক ও বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছাকাছি সংবেদনশীল জমি ও ভবন কিনেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে নিজেদের তথাকথিত ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ আরও তীব্র করতে রুশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গ্রীষ্মকালীন বাড়ি, ছুটির কেবিন, গুদামঘর, পরিত্যক্ত স্কুল, শহরের ফ্ল্যাট এমনকি পুরো দ্বীপও কিনেছে বলে অভিযোগ। এসব জায়গাকে নজরদারি, নাশকতা ও গোপন হামলার সমন্বিত অভিযানের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনটি ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা দ্য টেলিগ্রাফকে জানিয়েছেন, তাদের আশঙ্কা—কিছু স্থানে ইতিমধ্যেই বিস্ফোরক, ড্রোন, অস্ত্র ও ছদ্মবেশী অপারেটিভ মোতায়েন থাকতে পারে। কোনো সংকট দেখা দিলেই সেগুলো সক্রিয় করা হতে পারে।
চার বছর আগে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে মস্কোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নাশকতার ঘটনা বেড়েছে। লন্ডন ও ওয়ারশতে অগ্নিসংযোগ, পার্সেল বোমা, হত্যার ষড়যন্ত্র এবং ট্রেন লাইনচ্যুত করার চেষ্টার মতো ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা মহলের কেউ কেউ মনে করছেন, এগুলো হয়তো বড় আকারের অভিযানের আগে ‘পরীক্ষামূলক চাল’ ছিল।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, সরাসরি সামরিক হামলার বদলে ক্রেমলিন ‘গ্রে জোনে’ ন্যাটোর সংকল্প যাচাই করতে পারে। অর্থাৎ, অস্বীকারযোগ্য কিন্তু বড় আকারের হামলা চালিয়ে পরিবহন, যোগাযোগ ও জ্বালানি নেটওয়ার্ক অচল করে দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ–৫, অর্থাৎ যৌথ প্রতিরক্ষা ধারার প্রয়োগ জটিল করে তোলা হতে পারে।
এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নাশকতা অভিযান সরাসরি সামরিক হামলার মতো অনুচ্ছেদ ৫-এর পক্ষে ঐকমত্য তৈরি করে না। হামলার দায় অস্বীকার করা গেলে দায় নির্ধারণ কঠিন হয়। নিশ্চিত প্রমাণ না থাকলে সমর্থন জোগাড় করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।’
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ব্রিটেন
ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬-এর নতুন প্রধান ব্লেইজ মেট্রেউইলি তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ভাষণে সতর্ক করে বলেন, ব্রিটেন এখন ‘শান্তি ও যুদ্ধের মাঝামাঝি এক পরিসরে’ কাজ করছে। গত ডিসেম্বরে তিনি বলেন, ‘রাশিয়া আমাদের গ্রে জোনে পরীক্ষা করছে। তারা যুদ্ধের সীমার ঠিক নিচে থেকে কৌশল প্রয়োগ করছে।’
গত সপ্তাহান্তে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেন, ভ্লাদিমির পুতিন ইতিমধ্যে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘রাশিয়া বিশ্বে ভিন্ন জীবনধারা চাপিয়ে দিতে চায়। মানুষ যে জীবন বেছে নিয়েছে, তা বদলে দিতে চায়।’
মস্কোর বিরুদ্ধে সন্দেহ রয়েছে, তারা গুপ্তচর জাহাজ ও তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ ব্যবহার করে ব্রিটিশ জলসীমা ও অন্যান্য অঞ্চলে সমুদ্রতলের কেবলের কাছে সেন্সর ও দূরনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরক স্থাপন করেছে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, সামরিক ঘাঁটি বা গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোর কাছে সম্পত্তি কিনে স্থলভাগেও একই কৌশল নেওয়া হতে পারে।
এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কৌশলগত সম্পত্তিতে রুশ নাগরিকদের প্রায় বাধাহীন বিনিয়োগ একটি বড় হুমকি। জরুরি ভিত্তিতে এটি মোকাবিলা করা দরকার।’
ব্রিটেনকে এমন হামলার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। লন্ডনের ভক্সহলে এমআই–৬ সদর দপ্তর ও নাইন এলমসে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কাছাকাছি সন্দেহজনক সম্পত্তি কেনাবেচা তদন্ত করা হয়েছে। তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও কিছু রাজনীতিকের আশঙ্কা, পশ্চিম স্কটল্যান্ডের ফাসলেনে ট্রাইডেন্ট সাবমেরিন ঘাঁটির আশপাশে বা শেটল্যান্ডে সমুদ্রতলের কেবল অবতরণস্থলের কাছে দূরবর্তী সম্পত্তি রাশিয়া কিনে থাকতে পারে বা কিনতে পারে। সাইপ্রাসের আরএএফ আক্রোতিরির আশপাশেও রুশদের বাড়ি কেনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ফিনল্যান্ডে ‘সামরিক’ দ্বীপ নিয়ে উদ্বেগ
এখন ইউরোপীয় দেশগুলোকে ফিনল্যান্ডের পথ অনুসরণ করতে বলা হচ্ছে। গত জুলাইয়ে ফিনল্যান্ড রুশ ও বেলারুশ নাগরিকদের সম্পত্তি কেনার ওপর প্রায় পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর পর বাল্টিক দেশগুলোও একই ধরনের আইন গ্রহণ করে। তবে খুব কম ইউরোপীয় দেশ এত দূর গেছে। মালিকানার ফাঁকফোকর থাকায়, তথ্য প্রকাশের নিয়ম কঠোর করার পরও ব্রিটেন ঝুঁকিতে রয়েছে বলে উদ্বেগ আছে।
ফিনল্যান্ডের সতর্কতা এসেছে অভিজ্ঞতা থেকে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে দেশটি কৌশলগত স্থানে রুশ সম্পত্তি অধিগ্রহণের গোপন কৌশলের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ধারণা করা হচ্ছে, মস্কো এখন সেই মডেল ইউরোপজুড়ে অনুসরণ করছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে এয়ারিস্টন হেলমি নামের একটি কোম্পানি। তারা নীরবে আর্কিপেলাগো সাগর এলাকায় ১৭টি সম্পত্তি কিনেছিল। এর অনেকগুলোই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর কাছে, তুরকু বন্দরের আশপাশে। তুরকু ফিনল্যান্ডের সামুদ্রিক শিল্প ও নৌবাহিনীর কমান্ডের কেন্দ্র।
এই সম্পত্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল সাক্কিলুওতো দ্বীপ। ২০১৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সকালে আশপাশের বাসিন্দারা বিস্ময়ে দেখেন, হেলিকপ্টার ও স্পিডবোট থেকে শত শত ছদ্মবেশী কমান্ডো দ্বীপে নামছে।
তদন্তকারীরা যা পান, তা ছিল বিস্ময়কর। সেখানে নয়টি জেটি, একটি হেলিপ্যাড, নিরাপত্তা ক্যামেরা ও মুভমেন্ট ডিটেক্টর, ছদ্মবেশী জাল এবং ব্যারাকের মতো ভবন ছিল। প্রতিটিতে স্যাটেলাইট ডিশ ও উন্নত যোগাযোগ সরঞ্জাম লাগানো ছিল।
ফিনল্যান্ড সরাসরি মস্কোকে উসকানি না দিয়ে কোম্পানিটির রুশ মালিক পাভেল মেলনিকভের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ আনে। গত বছর তাঁকে সাজা দেওয়া হয়। রুশ সরকার গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ উড়িয়ে দেয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে কেবল ‘অসুস্থ মস্তিষ্কের’ লোক। তবে ফিনিশ রাজনীতিকেরা এতে সন্তুষ্ট হননি। তারা উল্লেখ করেন, এয়ারিস্টন হেলমি ফিনল্যান্ডের নৌবাহিনীর উদ্বৃত্ত ল্যান্ডিং ক্রাফটও কিনেছিল।
২০২২ সালে ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর কর্মকর্তারা বলছেন, রাশিয়া বড় প্রকল্প থেকে সরে এসেছে। এখন তারা ছোট আকারে কিন্তু ব্যাপকভাবে একই কৌশল অনুসরণ করছে। ইউরোপজুড়ে শত শত, এমনকি হাজার হাজার সাধারণ ভবনকে গুপ্তচরদের লিসেনিং পোস্ট, নিরাপদ আশ্রয় ও সম্ভাব্য অস্ত্রভান্ডারে রূপান্তর করার দিকে তারা মনোযোগ দিয়েছে।
কিছু সম্পত্তি সরাসরি রুশ রাষ্ট্রীয় মালিকানায়। বাইরে থেকে সেগুলো নিরীহ কাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত বলে দেখানো হয়। কিন্তু পশ্চিমা সরকারগুলো একে একে সেগুলো বন্ধ করতে শুরু করেছে। গত বছরের নভেম্বর মাসে পোল্যান্ড গদানস্ক বন্দর এলাকায় রাশিয়ার কনস্যুলেট বন্ধ করে দেয়। এর আগের বছর ব্রিটেন পূর্ব সাসেক্সে রুশ মালিকানাধীন একটি এস্টেটের কূটনৈতিক মর্যাদা বাতিল করে। প্রতিবেশীদের অভিযোগ ছিল, ওই সম্পত্তি থেকে নজরদারি ড্রোন উড়ানো হচ্ছিল।
লাটভিয়া তাদের বাল্টিক উপকূলে সোভিয়েত আমলের কয়েকটি রিসোর্ট বন্ধ করে দিয়েছে। আশঙ্কা ছিল, সেগুলো গোপন অভিযানের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। এর চেয়ে অনেক কঠিন হলো রুশ ব্যক্তি ও কোম্পানির মালিকানাধীন বিপুলসংখ্যক সম্পত্তির হিসাব রাখা। নরওয়েতে ক্রেমলিন-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেবিনগুলো আর্কটিক অঞ্চলের সংবেদনশীল সামরিক স্থাপনার কাছে অবস্থিত। এর মধ্যে আছে ট্রমস অঞ্চলের বারদুফস এয়ার বেসের ওপর দৃষ্টি রাখা মালসেলভ ফিয়েলান্সবির বাড়িগুলো। বারদুফস দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলোর একটি। সেখানে পাহাড়ের ভেতরে তৈরি হ্যাঙ্গারে অবস্থান করছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান।
রুশ অর্থোডক্স চার্চকে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ বলে মনে করে। তারা নরওয়ে ও সুইডেনে নৌঘাঁটি ও রাডার স্থাপনার কাছে সম্পত্তি কিনেছে। এতে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নরওয়ের বার্জেনে হাকোনসভার্ন নৌঘাঁটির দিকে তাকিয়ে আছে সোরেইদে প্রেয়ার হাউস। ২০১৭ সালে একটি রুশ অর্থোডক্স গির্জা এটি কিনে নেয়। তখন কর্মকর্তারা সতর্ক করেছিলেন, সেখান থেকে সংকেত বিঘ্নিত করা, ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করা এবং এলাকাটির বিশদ মানচিত্র তৈরির উদ্দেশ্যে আসা রুশদের আশ্রয় দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
সুইডেনের ভেস্টেরোস শহরে ২০২৩ সালে একটি গির্জা তৈরি করা হয়। সেটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিমানবন্দরের কাছে। চারপাশে বেড়া, ক্যামেরা এবং আক্রমণাত্মক কুকুর দিয়ে পাহারা দেওয়া হয়। পরে সুইডিশ গোয়েন্দারা এটিকে সম্ভাব্য গুপ্তচরবৃত্তির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে মূল্যায়ন করে। কর্মকর্তারা জানান, গির্জাটির দায়িত্বে থাকা পুরোহিত রাশিয়ার প্রধান বেসামরিক বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা এসভিআর-এর কাছ থেকে পদক পেয়েছেন।
লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের কৌশল ও জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ ফেলো চার্লি এডওয়ার্ডস বলেন, ‘দশ বছরের বেশি সময় ধরে রুশ সংশ্লিষ্ট সত্তাগুলো ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও নরওয়েতে সামরিক ঘাঁটি, বন্দর ও কৌশলগত সরবরাহ লাইনের কাছাকাছি পদ্ধতিগতভাবে সম্পত্তি কিনে আসছে।’ তিনি বলেন, ‘যা একসময় সন্দেহজনক বাণিজ্যিক কার্যক্রম মনে হতো, তা এখন হাইব্রিড যুদ্ধ, নজরদারি ও সম্ভাব্য নাশকতার স্বীকৃত উপায় হয়ে উঠেছে।’
নর্ডিক অঞ্চলের বাইরে ইউরোপের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও সতর্ক করেছে। সিসিলি, ক্রিট ও মূল ভূখণ্ড গ্রিসে নৌঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ জলপথের কাছে রুশ-সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি কেনা হয়েছে। একইভাবে লন্ডন, প্যারিস ও জেনেভার সংবেদনশীল স্থানের কাছেও এমন ক্রয়ের ঘটনা চিহ্নিত হয়েছে।
হেলসিঙ্কিভিত্তিক ভূরাজনৈতিক পরামর্শ প্রতিষ্ঠান নর্ডিক ওয়েস্ট অফিসের প্রধান চার্লি সালোনিয়ুস-পাস্টারনাক বলেন, শহরের ফ্ল্যাট কিনে শত্রু রাষ্ট্রকে দুর্বল করার কৌশল শীতল যুদ্ধের সময় থেকেই আছে। তিনি বলেন, ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন হেলসিঙ্কিতে বহু অ্যাপার্টমেন্টের মালিক ছিল। সেগুলো গুপ্তচরবৃত্তি, হানি ট্র্যাপ, অস্ত্র মজুত রাখা বা দ্রুত শহর দখলের প্রস্তুতির কাজে ব্যবহার হতো।’
সুইজারল্যান্ড এখন বিশেষ উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, স্যালিসবারি বিষপ্রয়োগ তদন্ত করা একটি ফেডারেল রাসায়নিক সুরক্ষা ইনস্টিটিউটের কাছে থাকা সম্পত্তি থেকে রুশ অপারেটিভরা ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে হস্তক্ষেপ করেছিল এবং অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের গতিবিধি অনুসরণ করেছিল। জেনেভার কাছে লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের আশপাশের গ্রামগুলোতেও রুশদের সম্পত্তি কেনার প্রবণতা বেড়েছে। এতে বিদ্যুৎ লাইন ও ডেটা কেবলে সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চীনের ‘দীর্ঘমেয়াদি’ গোপন কৌশল
নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বলছে, চীনও একই ধরনের, যদিও সীমিত পরিসরের, কৌশল অনুসরণ করছে। স্টকহোম সেন্টার ফর ইস্টার্ন ইউরোপ স্টাডিজের মিননা আলান্ডার বলেন, ‘রাশিয়া অনেক দিন ধরে এটা করছে, কিন্তু শুধু রাশিয়াই নয়।’ তিনি উল্লেখ করেন, সুইজারল্যান্ডে একটি বিমানঘাঁটির কাছে একটি হোটেল চীনা পক্ষ কিনেছিল। সেখানে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান রাখার পরিকল্পনা ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ২০২৪ সালে সুইস সামরিক বাহিনী সম্পত্তিটি কিনে নেয়।
তিনি আরও বলেন, ‘এখন আমরা বুঝতে পারছি একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন আছে। কিন্তু ইউরোপে আমরা এখনো এই কৌশল পুরোপুরি বোঝা এবং এর মোকাবিলা করার বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে আছি।’
কর্মকর্তারা বলছেন, চীনের লক্ষ্য বেশি দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির দিকে। ফাইবার-অপটিক রুট, ডেটা সেন্টার ও যোগাযোগ নোডের কাছে অবস্থান নিয়ে বেইজিং এখন এনক্রিপ্ট করা তথ্য সংগ্রহ করতে চায়। তাদের ধারণা, ভবিষ্যতে কম্পিউটিং প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এসব তথ্য পড়া সম্ভব হতে পারে।
রাশিয়ার উদ্দেশ্য বেশি তাৎক্ষণিক এবং বেশি বিপজ্জনক। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, তারা শুধু নজরদারির প্রস্তুতি নিচ্ছে না, হামলার প্রস্তুতিও নিচ্ছে। ভবিষ্যৎ কোনো সংকটে আগে থেকেই দখলে রাখা সম্পত্তি থেকে সমন্বিত ড্রোন হামলা বা নাশকতা চালানো হতে পারে।
সালোনিয়ুস-পাস্টারনাক বলেন, অস্ত্র মজুত রাখা কোনো রিসোর্ট-সদৃশ সম্পত্তিতে রুশ অপারেটিভদের হরিণ শিকারের পার্টির ছদ্মবেশে পাঠানো খুব কঠিন হবে না। উদাহরণ হিসেবে তিনি এয়ারিস্টন হেলমির সাক্কিলুতো আস্তানার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘১৫ বছর আগে এভাবে কথা বললে মানুষ বলত আপনি টম ক্রুজের সিনেমা বেশি দেখছেন। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। ইউক্রেনে আমরা দেখেছি, বড় যুদ্ধ শুরুর আগে অনেক ধরনের অপারেশন চলে।’
হুমকির মাত্রা বড় হলেও বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইউরোপীয় দেশগুলো যথেষ্ট দ্রুত সাড়া দিচ্ছে না। লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও নরওয়ে নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে। এস্তোনিয়া এই গ্রীষ্মে বিধিনিষেধ আনার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু রুশ ক্রেতাদের কাছে সম্পত্তি বিক্রি নিষিদ্ধ করার ইউরোপীয় ইউনিয়নব্যাপী একটি প্রস্তাব গত বছর ভেস্তে যায়। কিছু দেশ অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কায় আপত্তি তোলে।
বিশেষ করে সাইপ্রাস আপত্তি জানিয়েছিল বলে জানা যায়। অথচ দ্বীপটিতে ব্রিটিশ ঘাঁটির কাছে মস্কো-সংশ্লিষ্ট রিয়েল এস্টেট কেনার ঘটনা বেড়েছে। ফলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন আইন মিলিয়ে এক ধরনের জোড়াতালি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। এতে অনেক ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। তার ওপর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে সংবেদনশীল তথ্য ভাগাভাগিতে অনীহাও সমস্যা বাড়াচ্ছে।
এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ‘যত দিন পাল্টা গোয়েন্দা তৎপরতা শুধু জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে, তত দিন ইউরোপজুড়ে বিস্তৃত এই হুমকি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।’
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান