সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা মস্কোয় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করছেন। আল-শারার নেতৃত্বে ঠিক এক বছরের কিছু বেশি সময় আগে রাশিয়ার সাবেক মিত্র বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখা হচ্ছে। এই বৈঠকের মাধ্যমে সিরিয়ায়, বিশেষ করে সামরিকভাবে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে মস্কো। একই সঙ্গে আল-শারার সরকারও রাশিয়ার আস্থা অর্জনের চেষ্টা চালাচ্ছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, গতকাল বুধবার বৈঠকের আগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আল-শারা সিরিয়ায় ঐক্য রক্ষায় রাশিয়ার সমর্থনের জন্য পুতিনকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এই অঞ্চলের ‘স্থিতিশীলতায়’ রাশিয়া যে ‘ঐতিহাসিক’ ভূমিকা রেখেছে, তা সিরিয়া স্বীকার করে।
এদিকে ভ্লাদিমির পুতিন সিরিয়ায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে আল-শারার চলমান উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানান। একই সঙ্গে তিনি সিরিয়ার ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতা পুনরুদ্ধারের’ পথে অগ্রগতির জন্য আল-শারাকে অভিনন্দন জানান।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় এক দশকের বেশি সময় ধরে পুতিন ও আল-শারা পরস্পরবিরোধী অবস্থানে ছিলেন। এ কারণে সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়ে মস্কোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। বৈঠকের আগে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘আলোচনায় সিরিয়ায় আমাদের সেনাদের উপস্থিতি বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।’ বর্তমানে রাশিয়ার সেনারা সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চলে হামেইমিম বিমানঘাঁটি ও তারতুস নৌঘাঁটিতে অবস্থান করছে।
এর আগে চলতি সপ্তাহে রাশিয়া কুর্দিনিয়ন্ত্রিত উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার কামিশলি বিমানবন্দর থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করেছে বলে জানা যায়। এর ফলে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে রাশিয়ার একমাত্র সামরিক উপস্থিতি এখন ওই দুটি ভূমধ্যসাগরীয় ঘাঁটিতেই সীমাবদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটরের সাংবাদিক অ্যাম্বেরিন জামান সোমবার এক ভিডিও প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, ভিডিওটি কামিশলির পরিত্যক্ত রুশ ঘাঁটির।
ঐতিহাসিকভাবে সিরিয়া ছিল মধ্যপ্রাচ্যে মস্কোর অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র। শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন দামেস্কে ক্ষমতাসীন বাথ পার্টির সরকারকে ব্যাপক সামরিক ও অন্যান্য সহায়তা দিয়েছিল। তখন সিরিয়ার নেতৃত্বে ছিলেন হাফিজ আল-আসাদ, পরে তাঁর ছেলে বাশার আল-আসাদ।
লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাংক আরইউএসআইয়ের সহযোগী ফেলো স্যামুয়েল রামানি বলেন, বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দামেস্কে ‘জনবাদী ও রাশিয়াবিরোধী’ সরকার গড়ে উঠতে পারে, এই আশঙ্কায় ছিল মস্কো। রামানি বলেন, ‘তারা আশঙ্কা করেছিল, আল-শারা তাদের প্রভাব পুরোপুরি সরিয়ে দেবেন। কিন্তু সম্পর্ক আগের মতো না থাকলেও রাশিয়া বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছে।’
রামানির মতে, আল-শারা বাস্তববাদী কৌশল নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান বদলে গেলে যেন ঝুঁকি সামলানো যায়, সে জন্য তিনি আঞ্চলিক নয়, এমন শক্তিগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ছেন। রামানি বলেন, ‘ইরানকে দূরে রাখা হলে রিপাবলিকানরা সিরিয়ার রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগে নমনীয়। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা বিষয়টি নিয়ে বেশি সন্দিহান এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ নানা বিষয়ে ধীরগতিতে এগোতে চায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আল-শারারও রাশিয়ার প্রয়োজন আছে, সে কারণেই তিনি এই সম্পর্ক বজায় রাখছেন।’
গত অক্টোবরে মস্কো সফরের সময় আল-শারা সিরিয়ার যুদ্ধে রাশিয়ার ভূমিকার বিষয়টি গুরুত্বহীন করে দেখান এবং তুলনামূলক বন্ধুত্বপূর্ণ সুরে কথা বলেন। অথচ রাশিয়াই বাশার আল-আসাদ ও তাঁর স্ত্রীকে আশ্রয় দিয়েছিল। তারা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সিরিয়া ছেড়ে পালিয়ে যান, যখন আল-শারার নেতৃত্বে বিরোধী যোদ্ধারা দামেস্কের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। আল-শারা বাশার আল-আসাদকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ করেছেন। গত মাসে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্টের দমনপীড়নের শিকার সিরীয়দের জন্য অবশ্যই বিচার নিশ্চিত করা হবে।
এদিকে সিরিয়ায় নিজেদের উপস্থিতি ধরে রাখতে পুতিন বিশেষভাবে আগ্রহী। কারণ, চলতি মাসেই রাশিয়া আরেক মিত্র হারিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে অপহরণ করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। মঙ্গলবার চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই রেমোভিচ বেলৌসভ বলেন, ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি এবং ইরান ইস্যুতে মস্কো নিবিড়ভাবে নজর রাখছে। ইরান রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার হুমকির মুখে রয়েছে।
সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব রাশিয়া থেকে সরে এসে তাদের পররাষ্ট্রনীতির দিক পরিবর্তন করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়তে চায় বলে জানিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সেই উদ্যোগে সাড়া পাওয়া গেছে। এ মাসে কুর্দি নেতৃত্বাধীন ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) সঙ্গে সংঘর্ষে না জড়াতে সিরিয়াকে যে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র তা কঠোরভাবে কার্যকর করেনি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সংঘর্ষ বন্ধে একটি সমঝোতা হয়। বর্তমানে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে এখনো বজায় আছে।