হোম > বিশ্ব > চীন

চীনের তরুণদের নতুন ‘আইডল’ ৫৪ বছরের এক অধ্যাপক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

নৃতত্ত্ববিদ ও অধ্যাপক বিয়াও শিয়াং। ছবি: সংগৃহীত

চীনের তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন এক ভিন্নধারার ‘আইডল’। তিনি কোনো পপ তারকা কিংবা চলচ্চিত্র অভিনেতা নন; ৫৪ বছর বয়সী নৃতত্ত্ববিদ ও অধ্যাপক বিয়াও শিয়াং। তরুণদের উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা ও জীবনের অর্থ খোঁজার সংকট নিয়ে তাঁর খোলামেলা আলোচনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

চীনা তরুণী ঝিহান হান সম্প্রতি শিয়াংকে বর্ণনা করেছেন, ‘স্বর্গ থেকে পাঠানো একজন তারকা’ হিসেবে। তাঁর মতো অনেক তরুণের কাছে শিয়াং যেন এমন এক মানুষ, যিনি তাদের অস্থিরতা ও হতাশাকে সত্যিই বুঝতে পারেন।

রোববার এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানায়, চীনের অর্থনীতি ও প্রযুক্তি দ্রুত বিকশিত হলেও তরুণদের জীবনে উদ্বেগের মাত্রা কমেনি। চাকরি, প্রেম-সম্পর্ক, বাড়ি কেনা, প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক প্রত্যাশার চাপ তাদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলছে। ২৩ বছর বয়সী এক চীনা স্নাতক বলেন, শিক্ষা জীবন থেকে বাস্তব জীবনে প্রবেশের সময় অনিশ্চয়তা বেড়েছে। তাই মানুষ জীবনে একজন ‘নোঙর’ খোঁজে। শিয়াংয়ের কথায় তাঁরা মনে করেন, কেউ একজন তাঁদের অনুভূতিকে বুঝতে পারছেন।

সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে শিয়াংয়ের একটি বক্তৃতায় প্রায় ৫০০ মানুষ অংশ নেন। এক ঘণ্টারও বেশি সময় মান্দারিন ভাষায় কথা বলার পর প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন তিনি। অনুষ্ঠান শেষে অনেকে তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়ান। এক তরুণী ঘটনাটিকে আখ্যা দেন ‘একাডেমিক ফ্যান মিটিং’ হিসেবে।

চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও শিয়াংয়ের বক্তৃতা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তাঁর নিজের সাবেক প্রতিষ্ঠান পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তৃতার সময় আসন পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় তা সরাসরি সম্প্রচার করতে হয়েছিল। চীনা গণমাধ্যমে এমন কথাও ছড়িয়েছে—‘সন্দেহে পড়লে বিয়াও শিয়াংকে জিজ্ঞেস করো।’

শিয়াংয়ের মতে, চীনের তরুণদের বড় সমস্যা হলো নিজেদের মূল্যায়নের জন্য বাইরের স্বীকৃতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, ভালো চাকরি কিংবা সামাজিক মর্যাদাকে তাঁরা সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখছেন। এর পরিবর্তে অন্যদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে নিজের জীবনের অর্থ খুঁজে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

শিয়াং চীনা সমাজকে একটি ‘পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে’ রয়েছে বলে মনে করেন। তাঁর ভাষায়, আগের প্রজন্মের কাছে প্রচলিত ছিল—কঠোর পরিশ্রম করলে নিরাপদ চাকরি পাওয়া যাবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই সমীকরণ আর আগের মতো কার্যকর নয়।

চীনে যুব বেকারত্ব ২০২৩ সালের মাঝামাঝিতে ২১ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছিল। পরে সরকার এই সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। একই সময়ে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অফিসের চাপ এবং ৩৫ বছর বয়সের পর চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তরুণদের মধ্যে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

শিয়াং এ পরিস্থিতিকে বোঝাতে ‘ফ্লোটিং’ ও ‘ইনভলিউশন’-এর মতো ধারণা ব্যবহার করেন। তাঁর মতে, সবাই যখন ভালো ডিগ্রি, স্থায়ী চাকরি, বিয়ে ও বাড়ি কেনার জন্য একই দৌড়ে অংশ নেয়, সেই প্রতিযোগিতা তখন অর্থহীন চাপ তৈরি করে।

জার্মানিতে বসবাসকারী শিয়াং বর্তমানে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যানথ্রোপলজির পরিচালক। তাঁর জনপ্রিয়তা নিয়ে একসময় সহকর্মীদের সংশয় থাকলেও তিনি এতে উৎসাহিত। তিনি বলেন, কেউ তাঁকে ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ বললে তিনি সেটিকে প্রশংসা হিসেবেই নেবেন। কারণ মানুষকে নিজের মতো করে চিন্তা করতে পারার প্রভাবক হতে চান তিনি।