বিশ্বকাপ ফুটবলে জাপান শুধু মাঠের খেলাতেই নয়, দর্শক হিসেবেও এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। স্টেডিয়ামে ম্যাচ শেষে যেখানে অধিকাংশ দেশের সমর্থকদের রেখে যাওয়া খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিক বোতল আর ময়লার স্তূপ দেখা যায়, সেখানে জাপানি সমর্থকেরা উল্টো দৃশ্য উপহার দেন। তাঁরা নিজেরাই দাঁড়িয়ে থেকে পুরো গ্যালারি পরিষ্কার করে তবেই স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন।
এই ব্যতিক্রমী অভ্যাসটি প্রথমবারের মতো সারা বিশ্বের নজরে আসে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলে। সেবার ফ্রান্সে আয়োজিত ওই টুর্নামেন্টে জাপানি দর্শকদের ম্যাচ শেষে ময়লা পরিষ্কার করতে দেখা যায়। এরপর থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপেই এটি এক ধরনের ‘প্রথা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ ২০২২ সালের বিশ্বকাপেও একই দৃশ্য দেখা গেছে, যা বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ায়।
শুধু দর্শকেরাই নয়, জাপানের খেলোয়াড়েরাও এই সংস্কৃতির অংশ। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের কাছে হারার পর জাপানি দল নিজেদের ড্রেসিং রুম পরিষ্কার করে এবং রুশ ভাষায় একটি ধন্যবাদ বার্তা রেখে যায়। একইভাবে ২০২২ সালে সমর্থকেরা আরবি, ইংরেজি ও জাপানি ভাষায় ধন্যবাদ লিখে ময়লার ব্যাগে বার্তা সংযুক্ত করেছিলেন।
এই আচরণের মূল কারণ জাপানের সামাজিক শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে নিহিত। ছোটবেলা থেকেই জাপানি শিশুদের শেখানো হয়—যেখানেই থাকো, জায়গাটি পরিষ্কার রাখা তোমার দায়িত্ব। দেশটির অনেক স্কুলে কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকে না; শিক্ষার্থীরাই নিজের শ্রেণিকক্ষ, মাঠ এমনকি টয়লেট পর্যন্ত পরিষ্কার করে। এই অভ্যাসই বড় হয়ে তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
জাপানে একটি প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে—‘তাতসু তরি আতো বো নিগোসাজু’, যার অর্থ, ‘পাখি উড়ে গেলে কোনো চিহ্ন রেখে যায় না’। অর্থাৎ, যে জায়গায় গিয়েছ, সেটি যেমন পেয়েছিলে তেমনই রেখে যাও। এই দর্শন জাপানিদের আচরণে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘মেইওয়াকু’ (meiwaku), যার অর্থ অন্যের জন্য ঝামেলা বা অসুবিধা সৃষ্টি না করা। জাপানি সমাজে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মূল্যবোধ। তাই স্টেডিয়ামে ময়লা ফেলে রাখা মানে অন্যের জন্য সমস্যা তৈরি করা—যা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই আচরণ শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, বরং একটি সমষ্টিগত সামাজিক চেতনার প্রতিফলন। জনবহুল দেশ হিসেবে জাপানে সহাবস্থান টিকিয়ে রাখতে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ অপরিহার্য।
গণমাধ্যমেও এই বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হওয়ায় জাপানি সমর্থকদের মধ্যে এটি জাতীয় গর্বের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে বিশ্বকাপের বাইরেও, আন্তর্জাতিক ম্যাচ কিংবা অন্যান্য টুর্নামেন্টেও তাঁরা একইভাবে স্টেডিয়াম পরিষ্কার রাখার নজির স্থাপন করে চলেছেন।