রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়ে বন্দী হওয়া উত্তর কোরিয়ার দুই সেনাকে দক্ষিণ কোরিয়ায় নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাদের নিরাপত্তা যাচাই, জিজ্ঞাসাবাদ ও সামরিক-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের পর পুনর্বাসনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার একীকরণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট আইন ও অতীতের রীতিনীতি অনুযায়ী দুই সেনার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত আইন এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (এনআইএস) সাধারণত নিরাপত্তা হেফাজতে রেখে উত্তর কোরীয়দের পরিচয়, দেশ ছাড়ার কারণ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় যাচাই করে। এই তদন্ত ও অস্থায়ী সুরক্ষার মেয়াদ সাধারণত ৯০ দিন পর্যন্ত হতে পারে। বিশেষ পরিস্থিতিতে তা বাড়ানোও সম্ভব।
তবে দুই সেনার ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসাবাদ আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, তারা উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েনের বিষয়ে সরাসরি অভিজ্ঞতা রাখেন। দক্ষিণ কোরিয়ার বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা ইউ ইয়ং-ওন জানিয়েছেন, তিনি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে ওই দুই সেনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তাঁর দাবি, তারা উত্তর কোরিয়ার বিশেষ বাহিনীতে কাজ করেছেন। ফলে উত্তর কোরিয়ার সামরিক প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা এবং রাশিয়ার যুদ্ধে দেশটির অংশগ্রহণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার একীকরণ মন্ত্রী সাধারণত উত্তর কোরিয়া থেকে আসা ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। তবে জাতীয় নিরাপত্তার কারণে এনআইএসের পরিচালকও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। দুই সেনার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় তাদের পরিচয় ও অবস্থান দীর্ঘ সময় গোপন রাখা হতে পারে।
তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থাও পরীক্ষা করা হবে। ইউ ইয়ং-ওন জানান, ইউক্রেনে বন্দী অবস্থায় তাদের আলাদা করে রাখা হয়েছিল। দীর্ঘদিনের বন্দিত্ব, বিচ্ছিন্নতা ও অনিশ্চয়তা তাদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে কাউকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ, যেখানে নির্যাতন, নিপীড়ন বা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে। এই নীতিকে ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ বলা হয়।
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় আত্মহত্যা করা উত্তর কোরীয় সেনাদের প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে, ওই দুই সেনা একাধিকবার দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ফলে তাদের উত্তর কোরিয়ায় ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে মানবাধিকারগত প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
তৃতীয় জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধবন্দীদের সক্রিয় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দ্রুত মুক্তি ও নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের বিধান রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যুদ্ধ চলাকালে তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তর সব ক্ষেত্রেই নিষিদ্ধ।
দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউক্রেন এখনো দুই সেনাকে স্থানান্তরের সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি প্রকাশ করেনি। গবেষক পিটার ওয়ার্ডের মতে, যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবাসন সাধারণ নীতি হলেও, এতে তাদের মানবাধিকার বা কল্যাণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তৃতীয় দেশে স্থানান্তরের সুযোগ থাকতে পারে।
ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তার বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়া এখন পর্যন্ত মূলত অপ্রাণঘাতী সহায়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। দেশটি ইউক্রেনকে মাইন অপসারণ সরঞ্জামসহ বিভিন্ন সহায়তা দিয়েছে এবং পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে।
জুলাইয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেনস্কি একমত হন যে উত্তর কোরীয় যুদ্ধবন্দীদের বিষয়টি তাদের নিজেদের ইচ্ছা, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতির ভিত্তিতে পরিচালনা করা উচিত।
তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনও দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, সেনাদের নিরাপত্তা এবং উত্তর কোরিয়ায় থাকা তাদের স্বজনদের সুরক্ষার জন্য বিষয়টি গোপন রাখা প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে, ইউক্রেন দাবি করেছে, এমন কোনো গোপনীয়তা রক্ষার চুক্তি ছিল না।