শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলীয় জাফনার চেম্মানি এলাকায় এক শ্মশান সম্প্রসারণের কাজ করার সময় দুর্ঘটনাবশত উন্মোচিত হয়েছে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণকবর। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৩টি ধাপে চালানো খননকাজে শিশু ও নবজাতকসহ মোট ৫৭২ জনের কঙ্কাল ও মানুষের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। কয়েক দশক ধরে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে নিখোঁজ হওয়া হাজার হাজার তামিলদের স্বজনেরা এখন এই গণকবরের মধ্য দিয়েই প্রিয়জনদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল—তার উত্তর খুঁজছেন।
উদ্ধার হওয়া কঙ্কালগুলোর সঙ্গে মিলেছে কাচের চুড়ি, স্কুলের ব্যাগ এবং শিশুদের দুধের বোতলের মতো দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা জিনিসপত্র। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, শ্রীলঙ্কার প্রায় তিন দশকের গৃহযুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া তামিল বেসামরিক নাগরিকদেরই এখানে গণকবর দেওয়া হয়েছিল।
গত ফেব্রুয়ারিতে চেম্মানি এলাকায় শ্মশানের জমি খননের সময় হঠাৎ করেই স্থানীয় শ্রমিকেরা মানব কঙ্কালের সন্ধান পান। পরবর্তীতে বিচারিক নির্দেশে প্রত্নতাত্ত্বিকরা অনুসন্ধান ও খনন শুরু করেন।
উদ্ধারকৃত জিনিসপত্রের মধ্যে একটি দুধে ভরা বোতলের অবশিষ্টাংশ ও শিশুদের পোশাক দেখে বহু তামিল পরিবার নিশ্চিত যে, সেখানে কোনো সাধারণ সমাধি বা ধর্মীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়নি।
শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের ২৬ বছরে (১৯৮৩–২০০৯) প্রায় ১ লাখ মানুষ প্রাণ হারান এবং প্রায় ২৩ হাজার বেসামরিক নাগরিক—যাদের অধিকাংশই তামিল—নিখোঁজ হন। চেম্মানির এই একক গণকবরেই ৫৭২টি কঙ্কাল উদ্ধার হওয়ার ঘটনাটি পুরো তামিল সম্প্রদায়কে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। উদ্ধার হওয়া সমস্ত আলামত ও অবশিষ্টাংশ বর্তমানে জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগে আদালতের হেফাজতে সংরক্ষিত রয়েছে।
শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার গেহান গুণতিলকে জানিয়েছেন, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রাথমিক পরিদর্শনে স্পষ্ট যে এটি সাধারণ কোনো হিন্দু সামাজিক বা ধর্মীয় সমাধিস্থল নয়। এক থেকে দুই মিটার গভীরতার অগভীর গর্তে বস্ত্রহীন অবস্থায় অসংখ্য মানুষের দেহ গাদাগাদি করে একের ওপর এক স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। কমিশন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, এটি বেআইনি ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের স্পষ্ট আলামত বহন করে।
গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া হাজার হাজার মানুষের স্বজনদের কাছে এই গণকবর একই সঙ্গে চরম বেদনার এবং সত্য জানার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে ১২ বছর বয়সী জেরুবি জয়াবালানের বাবা কান্দাইয়া জয়াবালান চেম্মানি এলাকার একটি সেনাচৌকিতে শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর নিখোঁজ হন।
বিবিসিকে জেরুবি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম বাবা হয়তো কোনো ক্যাম্পে বা থানায় আছেন। সমস্ত সেনা ক্যাম্প আর থানায় ঘুরেও কোনো সন্ধান পাইনি। তিনি আর ফিরে আসেননি। সংবাদ পেয়ে আমি চেম্মানির গণকবরে ছুটে গিয়েছিলাম কোনো উত্তর পাই কিনা দেখতে। আমরা উদ্ধারকৃত কঙ্কালগুলোর নিরপেক্ষ ও বিস্তারিত ফরেনসিক বিশ্লেষণ চাই।’
একইভাবে ২০০৭ সালে ২৪ বছর বয়সে নিখোঁজ হওয়া একমাত্র ছেলে জ্ঞানশীলন রবির ছবি হাতে কাঁদছেন ৬৫ বছর বয়সী সুশীলা। তিনি বলেন, ‘ছেলেকে ছাড়া আমার জীবনটা পুরোপুরি শূন্য। আজও প্রতিদিন ওর জন্য কাঁদি। আমরা শুধু সত্যিটা জানতে চাই।’
চেম্মানি এলাকার ভয়াবহ অতীত শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত:
১৯৯৫ সাল: শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনী এলটিটিই-র হাত থেকে জাফনা উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়। সম্পূর্ণ চেম্মানি অঞ্চলকে ‘উচ্চ নিরাপত্তা অঞ্চল’ ঘোষণা করে সেনা ক্যাম্প ও চেকপোস্ট বসানো হয়, যা স্থানীয়দের কাছে ‘উন্মুক্ত কারাগার’ হিসেবে পরিচিত ছিল।
১৯৯৬ সাল: পোশাক পরিহিত ১৮ বছর বয়সী তামিল ছাত্রী কৃষান্থি কুমারস্বামীকে সেনা চৌকিতে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। তার খোঁজ করতে গিয়ে তার পরিবারের আরও তিন সদস্যও সেনাবাহিনীর হাতে প্রাণ হারান।
১৯৯৮ সাল: কলম্বোর একটি আদালত ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সেনা সদস্য সোমারত্নে রাজাপক্ষেকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর রাজাপক্ষে আদালতে জবানবন্দিতে দাবি করেন, চেম্মানি এলাকায় সেনাবাহিনীর হাতে নিহত অন্তত ৩০০ থেকে ৪০০ বেসামরিক নাগরিকের দেহ গণকবর দেওয়া হয়েছে।
১৯৯৯ সাল: রাজাপক্ষের জবানবন্দির ভিত্তিতে তৎকালীন সরকার চেম্মানিতে প্রথম খনন পরিচালনা করে ১০ টির বেশি কঙ্কাল উদ্ধার করে। তবে চলমান যুদ্ধের অজুহাতে সরকার সেই তদন্ত স্থগিত করে দেয় এবং কোনো ফলোআপ করা হয়নি।
শ্রীলঙ্কায় বিগত দশকগুলোতে ২০ টিরও বেশি গণকবরের সন্ধান মিললেও একটিরও বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হয়নি বা দায়ী কারও শাস্তি হয়নি। ২০১৮ সালে মান্নার শহরের কাছে ৩৫০ টির বেশি কঙ্কাল উদ্ধারের পর পরিচালিত তদন্তে কোনো সুনির্দিষ্ট ফলাফলে না পৌঁছানোয় তামিল জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর হতাশা ও সংশয় তৈরি হয়েছে।
ফলে বর্তমান চেম্মানি গণকবরের সত্যতাও সরকারের সদিচ্ছার অভাবে রাজনৈতিকভাবে ধামাচাপা পড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এ কারণে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবিতে উত্তরাঞ্চলে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ক্ষমতায় আসা প্রেসিডেন্ট অনুঢ়া কুমারা দিশানায়েকে শান্তি ও জাতিগত পুনর্মিলনের প্রতিশ্রুতি দিলেও, কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এই তদন্তে যুক্ত করার কঠোর বিরোধী।
শ্রীলঙ্কার বিচারমন্ত্রী হার্শনা নানায়াক্কারা বিবিসিকে বলেছেন, ‘আমরা চেম্মানিতে খননকাজ চালিয়ে যাব। কঙ্কালগুলোর বিশ্লেষণ, মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ এবং নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনার সাথে মিলিয়ে দেখার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকার এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেবে।’
অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার ওয়ারুনা গামাগে সমস্ত বেসামরিক নাগরিককে হত্যা ও গণকবর দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বিবিসিকে বলেন, ‘আদালতেই যেকোনো অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ হতে হবে।’
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান রোরি মুঙ্গোভেন জানান, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিচারের অপেক্ষায় থাকা ভুক্তভোগী পরিবারগুলো পূর্ববর্তী তদন্তগুলোর ওপর সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। এই তদন্তে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত সহায়তা যুক্ত করা হলে এর নির্ভরযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।’
মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ (এইচআরডব্লিউ) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গুম ও হত্যাকাণ্ডের বহু মামলার তদন্ত এখন স্থবির হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে বিচারপ্রার্থী পরিবারগুলোকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।