ভিয়েতনামকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে সহায়তা করবে দক্ষিণ কোরিয়া। ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে দুই দেশের প্রেসিডেন্টের মধ্যে বৈঠকে এই বিষয়ে বোঝাপড়া হয়। এ ছাড়া দুই দেশ বাণিজ্যের পরিমাণ ৫০ শতাংশের বেশি বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে।
জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তো লাম ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে লি জে মিউংকে স্বাগত জানান। গতকাল বুধবার রাতে ভিয়েতনাম জানায়, লি বলেছেন, তাঁর দেশ ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও প্রশিক্ষণের মতো ভবিষ্যৎ শিল্পে প্রযুক্তি ভাগ করে নিতে প্রস্তুত।’ একই সঙ্গে তিনি ভিয়েতনামকে অনুরোধ করেছেন, কোরিয়ান কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ প্রকল্পে থাকা ‘বাধা দূর করতে।’
ভিয়েতনাম জানায়, দক্ষিণ কোরিয়া অতিরিক্ত বৈদেশিক সহায়তা দেবে এবং দক্ষিণ চীন সাগরে শান্তি বজায় রাখতে সমর্থন জানাবে। এই অঞ্চলে ভিয়েতনাম ও চীনের মধ্যে দ্বন্দ্বপূর্ণ দাবি রয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়াকে ভিয়েতনামের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
দুই দেশ নিরাপত্তা, ডিজিটাল সহযোগিতা, মেধাস্বত্ব, পানি নিরাপত্তা ও জ্বালানি খাতসহ মোট ১২টি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর মধ্যে দুটি পারমাণবিক শক্তি নিয়ে। প্রথমটি পেট্রোভিয়েতনাম, কোরিয়া ইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশন (কেপকো), এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব কোরিয়া এবং কোরিয়া ট্রেড ইনস্যুরেন্স কর্পের মধ্যে আর্থিক চুক্তি। দ্বিতীয়টি কেপকো ও পেট্রোভিয়েতনামের যৌথ উন্নয়ন নিয়ে।
পেট্রোভিয়েতনাম জানায়, সরকার তাদের নিন থুয়ান-২ নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের বিনিয়োগকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ‘টেকসই উৎস ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’ দ্রুত বর্ধনশীল দেশটি ২০১৬ সালে পারমাণবিক প্রকল্প বাতিল করলেও ২০২৪ সালে তা পুনরুজ্জীবিত করে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটসহ নানা কারণে বিদ্যুৎ ঘাটতির মুখে পড়েছে তারা।
দক্ষিণ কোরিয়ার কারখানাগুলো ভিয়েতনামকে বড় উৎপাদন শক্তিতে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, বিশেষ করে স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের পণ্যের বড় উৎস হিসেবে। ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে ৯০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আদান-প্রদান করা হয়েছে। ভিয়েতনামের পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর দক্ষিণ কোরিয়া এখন ভিয়েতনামের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। তবে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রটি উৎপাদন স্থানীয়করণ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরে পিছিয়ে আছে এবং সিউলের কাছে আহ্বান জানিয়েছে, ‘ভিয়েতনামের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষিণ কোরিয়ার উৎপাদন সরবরাহ শৃঙ্খলে অন্তর্ভুক্ত করতে সহায়তা’ দিতে।
লি মঙ্গলবার ভারত সফর শেষে হ্যানয়ে পৌঁছান। এই প্রথম লি প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে বের হলেন। তিনি শুক্রবার পর্যন্ত ভিয়েতনামে থাকবেন। অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা লাম গত সপ্তাহে দ্বৈত পদে প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে চীন সফর করেন।
হ্যানয় জানিয়েছে, দুই দেশ আরও বেশি আমদানি গ্রহণে বাজার উন্মুক্ত করবে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ডেটা সেন্টার, বন্দর ও অন্যান্য অবকাঠামোতে যৌথভাবে কাজ করবে। তারা কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়েও একমত হয়েছে। তবে উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট সরকারের সঙ্গে ভিয়েতনামের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভিয়েতনামে ১ লাখ ৯৩ হাজার দক্ষিণ কোরিয়ান বসবাস করেন, যা পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাকি অংশ মিলিয়েও বেশি। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩ লাখ ৩৭ হাজার ভিয়েতনামি বাস করেন। দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ, বিবাহ ও কর্মসূচি এসব বিনিময়কে ত্বরান্বিত করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বহু বছর ধরে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে ভিয়েতনামের শীর্ষ বিনিয়োগকারী ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনা কোম্পানির মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে কিছুটা অবস্থান হারিয়েছে। ২০২৫ সালে তারা নতুন বিনিয়োগ হিসেবে ৯০০ মিলিয়ন ডলার নিবন্ধন করেছে, যা ভিয়েতনামে বিনিয়োগকারী দেশগুলোর মধ্যে তাদের পঞ্চম স্থানে নামিয়ে এনেছে বলে জানিয়েছে দেশটির পরিসংখ্যান দপ্তর।