হোম > বিশ্ব > এশিয়া

৭০ মিটার গভীর থেকে এক শিশুকে তুলে এনে আফগানিস্তানে নায়ক ১১ বছরের হজরত ওমর

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

উদ্ধার করার কিছুদিন পর ৫ বছরের শিশু জইনুল্লাহর সঙ্গে হজরত ওমর। ছবি: বিবিসি

আফগানিস্তানের কান্দাহার প্রদেশে ৭০ মিটার গভীর একটি পরিত্যক্ত কূপে পড়ে গিয়েছিল পাঁচ বছরের শিশু জইনুল্লাহ। সরু, অন্ধকার ও পানিতে ভেজা কূপটির নিচে আটকে থাকা শিশুটিকে উদ্ধার করতে গিয়ে একের পর এক চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ১১ বছরের কিশোর হজরত ওমরের অসীম সাহসিকতায় প্রায় অসম্ভব সেই উদ্ধার অভিযান সফল হয়।

রোববার (৪ অক্টোবর) বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে কূপে পড়ে গিয়েছিল জইনুল্লাহ। কূপটির ব্যাস ছিল মাত্র ৩০ সেন্টিমিটার। এত সরু গর্ত দিয়ে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পক্ষে নিচে নামা সম্ভব ছিল না। উদ্ধারকারীরা দড়ি নামিয়ে দিলেও আতঙ্কিত শিশুটি সেটি শরীরে বাঁধতে পারছিল না। ক্যামেরা নামিয়ে তার অবস্থান শনাক্ত করা হলেও তাকে সরাসরি তুলে আনার উপায় মিলছিল না।

প্রথমে আরও তিন শিশু কূপে নামার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নিচে গিয়ে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় তারাও উঠে আসতে বাধ্য হয়। তখন উদ্ধারকারীরা হজরত ওমরের সাহায্য চান। এর আগে একই ধরনের একটি উদ্ধার অভিযানে সে কূপে নেমেছিল বলে জানা যায়।

চাচার অনুমতি নিয়ে হজরত ঝুঁকি নিয়েই নিচে নামতে রাজি হয়। প্রথমবার দড়ি দিয়ে নামার সময় তার কাঁধ ও ঊরু আটকে যায়। ব্যথায় চিৎকার করলে তাকে ওপরে তুলে আনা হয়। তবে দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় সে কূপের গভীরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

নিচে গিয়ে হজরত প্রথমবার জইনুল্লাহকে দেখতে পায়। সে শিশুটির হাত দড়ির সঙ্গে বেঁধে দেয়। এরপর ওপরে থাকা শত শত মানুষ ধীরে ধীরে দড়ি টানতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর কাদায় ঢাকা হজরতকে ওপরে তুলে আনা হয়। তারপরই ওপরে উঠে আসে জইনুল্লাহ। হাসপাতালে নেওয়ার পর পরদিনই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

আফগানিস্তানে এই ধরনের দুর্ঘটনা ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। দীর্ঘ খরা ও ভূগর্ভস্থ পানির সংকটের কারণে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা গভীর নলকূপ খনন করছেন। পানি শেষ হয়ে যাওয়ার পর অনেক নলকূপ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। কাঠ ও মাটি দিয়ে এগুলোর মুখ বন্ধ করা হলেও সময়ের ব্যবধানে ক্ষয়ে গিয়ে আবার উন্মুক্ত হয়ে যায়।

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে আফগানিস্তানে এমন ১০০ টির বেশি নলকূপ দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। অধিকাংশ দুর্ঘটনার শিকার ১০ বছরের কম বয়সী শিশু এবং প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।

পানি বিশেষজ্ঞ নাজিবুল্লাহ সাদিদের মতে, ২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানের দুর্বল অর্থনীতি আরও সংকটে পড়ে। কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় বহু মানুষ কৃষিকাজে ফিরে যায়। একই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও দীর্ঘস্থায়ী খরায় পানির স্তর নিচে নেমে যেতে থাকে। সস্তা সৌর প্যানেলের সহজলভ্যতার কারণে কৃষকেরা দিনভর ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে সক্ষম হওয়ায় গভীর নলকূপের সংখ্যা দ্রুত বাড়ে।

স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এখন প্রায় পাঁচ লাখ নলকূপ থাকতে পারে। এগুলোর বড় অংশ হেলমান্দ নদী অববাহিকায়। কোনো কোনো এলাকায় মাত্র কয়েক মিটারের ব্যবধানে দুই-তিনটি নলকূপও দেখা যায়।

এই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজে বড় ভূমিকা রাখছেন দক্ষিণ হেলমান্দের ২৮ বছর বয়সী মোবাইল ফোন বিক্রেতা মিরাজান আবদুল্লাহ। ২০২১ সালে নিজের গ্রামে পাঁচ বছরের এক শিশু কূপে পড়ে মারা যাওয়ার পর তিনি একটি বিশেষ উদ্ধারযন্ত্র তৈরি করেন। তাঁর পদ্ধতিতে ক্যামেরা ও কম্পিউটারের সাহায্যে কূপের ভেতরের অবস্থান দেখা যায় এবং সঠিক জায়গায় দড়ি নামানো সম্ভব হয়।

গত চার বছরে মিরাজান ১১৩টি উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়ে প্রায় ৭০ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছেন।

তবে সমস্যা শুধু দুর্ঘটনার নয়, পরিবেশগতও। খরার কারণে কূপগুলো আরও গভীর হচ্ছে—কখনো কখনো তা ২০০ মিটার পর্যন্ত। এতে ভূগর্ভস্থ পানির মজুত দ্রুত কমছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে কোনো কোনো অঞ্চল বসবাসের অনুপযোগী হয়ে মানুষকে অন্যত্র চলে যেতে হতে পারে।

এদিকে তালেবান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা করছে। অনুমতি ছাড়া পানীয় জল ছাড়া অন্য কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে তারা।

জইনুল্লাহকে উদ্ধারের আট মাস পর হজরত ওমরের সঙ্গে আবার দেখা হয় তার। শিশুটির পরিবার হজরতকে উপহার দিয়ে ধন্যবাদ জানায়। স্থানীয় শিশুদের কাছে হজরত এখন একজন নায়ক।

তার ভাষায়, গ্রামে শিশুরা তাকে দেখলেই বলে—সে একজন সাহসী ও অসাধারণ কাজ করেছে।