হোম > বিশ্ব > এশিয়া

রাখাইনে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায় নিহত ৩৩, আহত আরও ৩৬ জন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

রাখাইনের একটি বাজারে জান্তাবাহিনী বিমান হামলার পর সেখান থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। ছবি: এএফপি

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় অন্তত ৩৩ জন নিহত হয়েছে। স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার বাংলাদেশ-সংলগ্ন দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনের উত্তরে একটি বাজারের কাছে এই হামলা চালানো হয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

স্থানীয় উদ্ধারকর্মী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলায় আরও ৩৬ জন আহত হয়েছেন। ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকে সামরিক সরকার গণতন্ত্রপন্থী ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে যে হামলা চালিয়ে আসছে, এই হামলা তারই সর্বশেষ ঘটনা।

রাখাইনের বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি জানিয়েছে, স্থানীয় সময় দুপুরে একটি যুদ্ধবিমান কিয়াউকতাও শহরের একটি স্থানীয় বাজারের কাছে দুটি বোমা ফেলে। এতে দোকানদার, ক্রেতা ও পথচারীসহ ৩৩ জন নিহত হয়েছেন। তারা বলেছে, মৃতের সংখ্যা ‘আরও বাড়তে পারে।’

রাখাইনের এক জ্যেষ্ঠ উদ্ধারকর্মী ওয়াই হুন অং বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ওই বাজারটি ছিল পুরো অঞ্চলের প্রধান পাইকারি কেন্দ্র। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা সেখানে আসতেন। তিনি বলেন, ‘রাখাইনে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ বিমান হামলাগুলোর একটি।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে ভবনগুলোতে আগুন জ্বলতে, ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহন এবং কাছের একটি সেতুর কিছু অংশ ধ্বংস হয়ে যেতে দেখা গেছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে এর আগে তারা বলে এসেছে, তারা কেবল বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। একই সঙ্গে তারা প্রতিরোধকারী গোষ্ঠীগুলোকে ‘সন্ত্রাসবাদের’ জন্য অভিযুক্ত করেছে।

মিয়ানমারে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকেই সংঘাত চলছে। ওই অভ্যুত্থানে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর দেশজুড়ে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ আন্দোলন ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। একদিকে রয়েছে সামরিক সরকার, অন্যদিকে রয়েছে বিভিন্ন সশস্ত্র জাতিগত গোষ্ঠী ও গণতন্ত্রপন্থী সশস্ত্র সংগঠনের জোট।

মিয়ানমারের সাবেক সামরিক সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং এপ্রিল মাসে সামরিক বাহিনী-সমর্থিত পার্লামেন্টের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এর ফলে পাঁচ বছর ধরে চলা সেনাশাসনের পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করেন।

রাখাইনের একটি বাজারে জান্তাবাহিনী বিমান হামলার পর সেখান থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। ছবি: এএফপি

আরাকান আর্মি একটি প্রশিক্ষিত ও শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী। তারা রাখাইনের জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য স্বায়ত্তশাসন চায়। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে তারা বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর তারা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সামরিক সদর দপ্তর এবং রাজ্যের মোট ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪ টির নিয়ন্ত্রণ দখল করেছে।

সেখানে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর থেকে সামরিক বাহিনী রাখাইনের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের পথগুলোর ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর ফলে খাদ্যসংকট আরও ভয়াবহ হয়েছে। ডিসেম্বরে রাখাইনের ম্রাউক ইউ টাউনশিপের একটি হাসপাতালে সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিহত এবং আরও ৭০ জন আহত হন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের কারণে রাখাইনে প্রায় ৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

জাতিসংঘ আগস্ট মাসে আরও জানিয়েছিল, মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি ‘নতুন এক নিম্নস্তরে’ নেমে গেছে। সংস্থাটি রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ওপর ‘নির্মম নির্যাতন’ এবং অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভয়াবহ প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ মিনারেল উত্তোলনের জন্য অবৈধ খননও রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতে এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী উভয় পক্ষই ড্রোন ব্যবহার করছে। আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।