জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে সমুদ্রপথে সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। এই এক বছরে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন। এই সমুদ্রপথের ইতিহাসে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর।
গতকাল শুক্রবার জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র বাবর বালুচ বলেন, গত বছর সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে আনুমানিক ৬ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গার মধ্যে প্রতি সাতজনে একজন নিখোঁজ বা মারা গেছেন। বিশ্বজুড়ে শরণার্থী ও অভিবাসীদের সমুদ্রযাত্রার ক্ষেত্রে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যুহার।
বালুচ আরও জানান, ২০২৬ সালেও এই ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত ২ হাজার ৮০০-এর বেশি রোহিঙ্গা এই পথ বেছে নিয়েছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমুদ্র পাড়ি দিতে চাওয়া ব্যক্তিদের অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর।
মিয়ানমারের সংঘাত থেকে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটের কারণে এই প্রাণঘাতী সমুদ্রযাত্রা এখন একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মুসলিম সংখ্যালঘু এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনের আশায় জরাজীর্ণ ও উপচে পড়া ভিড়ের নৌকায় চড়ে জীবন বাজি রাখছেন।
নিজ দেশে সহিংসতা এবং বাংলাদেশের জনাকীর্ণ শরণার্থী শিবিরের মানবেতর পরিস্থিতির কারণেই মূলত রোহিঙ্গারা এসব যাত্রা শুরু করছেন। তাদের লক্ষ্য থাকে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে পৌঁছানো।
জাতিসংঘের শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক সংস্থাগুলো এই সপ্তাহে জানিয়েছে, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় টেকনাফ থেকে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়ে ছেড়ে যাওয়া একটি নৌকা আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়ায় প্রায় ২৫০ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
বাবর বালুচ জানান, বিশ্বজুড়ে দাতা দেশগুলোর তহবিল কমানোর ফলে মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা বাংলাদেশে অবস্থানরত ১০ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে চরম হতাশা সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মধ্যে এই দুঃখজনক ও মর্মান্তিক প্রবণতা এবং হতাশা অব্যাহত রয়েছে।’
বাবর বালুচ আরও বলেন, ‘চরম হতাশা কাজ না করলে কেউ তার পরিবারকে এমন ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় তুলে দিত না, যেখানে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।’
কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির ও ভাসানচরে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী খাদ্য, পানি, আবাসন ও চিকিৎসার মতো মানবিক সহায়তার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। তাদের সহায়তায় এ বছর ইউএনএইচসিআর ২০ কোটি ডলারের আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় তহবিলের মাত্র ৩২ শতাংশ পাওয়া গেছে।
ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এ অঞ্চলে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন, যার মধ্যে ১২ লাখই অবস্থান করছেন বাংলাদেশে।