মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হতে চায় তুরস্ক। দেশটির শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ২০২৮ সালের মধ্যে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩১ শতাংশের বেশি বাড়িয়ে ৫ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে এই সংখ্যা দ্বিগুণ করারও পরিকল্পনা রয়েছে।
তুরস্কের উচ্চশিক্ষা পরিষদের (ইয়োক) তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৫০৭ জনে। মাত্র এক দশকে দেশটিতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৩ সালে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট ভর্তির মাত্র ০.৯ শতাংশ ছিল বিদেশি শিক্ষার্থী, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৫.৫ শতাংশ।
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) জাপানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘নিক্কেই এশিয়া’-এর এক প্রতিবেদনে ইন্দোনেশীয় শিক্ষার্থী আজকা মৌলা ইস্কান্দার মুদার কথা তুলে ধরা হয়। তিনি তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুলে অবস্থিত বেসরকারি কোচ ইউনিভার্সিটিতে স্নাতকোত্তর করছেন। এর আগে তিনি আঙ্কারার সরকারি মিডল ইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি (মেটু) থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
কম্পিউটিং প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে চাওয়া মুদা জানান, ইউরোপের তুলনায় তুরস্কে গবেষণা ব্যয় অনেক কম। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন—ইউরোপে অপটিক্যাল চিপ তৈরি করতে হাজার হাজার ইউরো খরচ হতে পারে। কিন্তু তুরস্কে তিনি ঘণ্টায় মাত্র ১৫০ লিরায় লিথোগ্রাফি মেশিন ব্যবহার করে নিজেই তা তৈরি করতে পারছেন। পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ২ হাজার লিরা।
গত দশ বছরে তুরস্কে ইন্দোনেশীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৫৫ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৪৬০ জনের বেশি হয়েছে। পাকিস্তান থেকেও প্রায় ৬ হাজার শিক্ষার্থী পড়তে এসেছে। বর্তমানে বিদেশি শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় উৎস তুর্কমিনিস্তান (৬৫ হাজার ৮৮৪ জন)। এরপরই রয়েছে সিরিয়া, আজারবাইজান, ইরান, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তান।
তুরস্কের উচ্চশিক্ষা পরিষদ ইয়োক-এর সভাপতি এরোল ওজভার জানিয়েছেন—এশিয়ার শিক্ষার্থীদের আকর্ষণে মালয়েশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা করছে তুরস্ক। বর্তমানে তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদেশি শিক্ষার্থী মুসলিমপ্রধান দেশ থেকে আসে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিল, ভৌগোলিক কাছাকাছি অবস্থান এবং তুলনামূলক কম খরচ—এসব কারণেই তুরস্ক জনপ্রিয় হচ্ছে।
২০২৬ সালের টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংয়ে তুরস্কের চারটি বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ ৫০০-তে জায়গা করে নিয়েছে। এর মধ্যে এগিয়ে রয়েছে কোচ ইউনিভার্সিটি, এরপর মিডল ইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি এবং সাবানসি ইউনিভার্সিটি। এ ছাড়া শীর্ষ ১ হাজারের মধ্যে তুর্কের মোট ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় ঠাঁই পেয়েছে।
তুরস্ক ইতিমধ্যে ইন্দোনেশিয়া, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ব্রুনেই, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা সহযোগিতা চুক্তি করেছে। পাশাপাশি আজারবাইজান, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তানে তাদের একাডেমিক ইউনিট চালু হয়েছে। ইরাক ও পাকিস্তানেও একই পরিকল্পনা রয়েছে।
গত অক্টোবরে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিস্যেপ তাইয়েপ এরদোয়ান জানান, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ৯৫ শতাংশই নিজ খরচে পড়াশোনা করেন এবং তারা বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে যোগ করেন।
তবে সমালোচকেরা বলছেন—ভর্তি সংখ্যা বাড়াতে গিয়ে কিছু তুর্কি বিশ্ববিদ্যালয় মানদণ্ড শিথিল করেছে। এ প্রসঙ্গে ওজভার জানান, শিক্ষার্থীর মানোন্নয়নে ‘টিআর-ওয়াইওএস’ ভর্তি পরীক্ষা উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি ইন্টারন্যাশনাল ব্যাকালরিয়েট, অ্যাবিটুর ও এসএটি-এর মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডও বিবেচনায় নেওয়া হয় সেখানে।
বর্তমানে প্রায় ৭৫ শতাংশ বিদেশি শিক্ষার্থী তুর্কি ভাষায় পড়াশোনা করেন, আর ২৩ শতাংশ ইংরেজিতে। ইংরেজি মাধ্যমে পাঠদান বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ভাষা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ তুরস্কে। ইস্তাম্বুলে অবস্থিত ইলদিজ টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাকিস্তানি শিক্ষার্থী মুহাম্মদ বিলাল হাসান জানিয়েছেন, কোর্স ইংরেজিতে হলেও অনেক শিক্ষক মাঝেমধ্যে তুর্কি ভাষায় পাঠদান শুরু করে দেন।
যুক্তরাষ্ট্রে পড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন ইরানি শিক্ষার্থী সামার কাজেমিনেজাদ। কিন্তু ভিসা জটিলতায় পারেননি। তিনি বলেন—তুরস্ককে তাঁর কাছে পরিচিত ও আপন মনে হয়। মাত্র তিন ঘণ্টার ফ্লাইটে দেশে যাওয়া যায়, সংস্কৃতিতেও মিল রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও তিনি মনে করেন, ‘তুরস্ক আমার কাছে ঘরের মতো।’