ইরানের কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা মধ্যস্থতা করার চেষ্টাকারী দেশগুলোকে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁদের দুবার ধোঁকা দিয়েছেন এবং ‘আমরা আর বোকা হতে চাই না।’ আলোচনা সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র এই তথ্য দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র চায় আগামীকাল বৃহস্পতিবারের মধ্যেই পাকিস্তানের ইসলামাবাদে শহরে মুখোমুখি শান্তি আলোচনা শুরু হোক। কিন্তু আগের দুই দফা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সময় ট্রাম্প একদিকে চুক্তির কথা বললেও অন্যদিকে হঠাৎ বিধ্বংসী হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন।
এর আগে গত বছরের জুনে নির্ধারিত পারমাণবিক আলোচনার কয়েক দিন আগে ট্রাম্পের সমর্থনে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দুই দফার আলোচনা শেষে আরেক দফা আলোচনার বিষয়ে প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছায়। কিন্তু তার দুই দিন পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালায়।
ইরানি কর্মকর্তারা মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা এবং ট্রাম্পের বড় আকারের অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত তাঁদের সন্দেহ বাড়িয়েছে। তাঁরা মনে করছেন, শান্তি আলোচনার প্রস্তাবটি আসলে একটি ফাঁদ হতে পারে। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো হলো পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্ক।
ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আশপাশে বিপুল সামরিক শক্তি জড়ো করার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প দেখাতে চান তিনি শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনা করতে চান, খারাপ উদ্দেশ্যে নয়। ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা বলেন, ‘ট্রাম্পের এক হাত চুক্তির জন্য বাড়ানো, আর অন্য হাত মুষ্টিবদ্ধ, আঘাত করার জন্য প্রস্তুত।’
হোয়াইট হাউস ইরানকে বার্তা দিয়েছে, ট্রাম্প আলোচনায় সত্যিই আগ্রহী। প্রমাণ হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনায় অংশ নিতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুটি সূত্র জানায়, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফই ভ্যান্সের নাম সুপারিশ করেছিলেন। কারণ, তাঁর পদমর্যাদা উচ্চ এবং ইরান তাকে কঠোরপন্থী হিসেবে দেখে না।
মঙ্গলবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সঙ্গে বিশ্বাস তৈরির একটি উদ্যোগ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তারা গতকাল এমন কিছু করেছে যা সত্যিই আশ্চর্যজনক। তারা আমাদের একটি উপহার দিয়েছে এবং আজ সেটি পৌঁছেছে। এটি খুব বড় একটি উপহার, যার মূল্য বিপুল।’ এই বিষয়ে কোনো বিস্তারিত না দিয়ে ট্রাম্প বলেন, এই ‘উপহার’ তেল-গ্যাস সম্পর্কিত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের সঙ্গে যুক্ত।
ট্রাম্প দাবি করেন, এতে বোঝা যায় যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের সঠিক লোকদের সঙ্গেই কথা বলছে। তিনি বলেন, ‘তারা বলেছিল তারা এটা করবে এবং করেছে। আর এটা কেবল তারাই করতে পারত।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা বলেন, ট্রাম্প একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধান এবং সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প তৈরি করছেন, যাতে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
তাঁরা আরও বলেন, আলোচনা হলেও যুদ্ধ আরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ চলার পরিকল্পনা রয়েছে। মঙ্গলবার ট্রাম্প প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে ইরানের ওপর সামরিক চাপ বজায় রাখতে বলেছেন বলে এক কর্মকর্তা জানান। এর কিছুক্ষণ পর হেগসেথ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা বোমা দিয়ে আলোচনা করি।’
পর্দার আড়ালে আলোচনার চেষ্টা চললেও পেন্টাগন মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড—সেন্টকমকে দেওয়া সামরিক নির্দেশনায় এখনো কোনো পরিবর্তন আনেনি। আগামী দিনলোতে মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা পাঠানো হবে। এর মধ্যে কয়েকটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন এবং হাজার হাজার সৈন্য রয়েছে। একটি মেরিন ইউনিট এই সপ্তাহেই পৌঁছাবে এবং আরেকটি শিগগির রওনা দেবে। ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের কমান্ড অংশ এবং কয়েক হাজার সৈন্য নিয়ে একটি পদাতিক ব্রিগেডও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, স্থল অভিযান একটি বিকল্প হিসেবে রয়েছে, তবে ট্রাম্প এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। সূত্রগুলো জানায়, সোমবার সকালে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান একটি ১৫ দফা মার্কিন পরিকল্পনা পেয়েছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে আলোচনা হওয়ার কথা জানানোর কয়েক ঘণ্টা আগেই এটি দেওয়া হয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র পুরো পরিকল্পনাটি একসঙ্গে আলোচনা করতে চায়। এতে রয়েছে যুদ্ধ শেষ করা, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বিষয়ে নিশ্চয়তা পাওয়া। সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র এই ১৫ দফা পরিকল্পনাকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে দেখছে এবং বৃহস্পতিবার পাকিস্তানে সরাসরি বৈঠকে ইরানকে এটি নিয়ে আলোচনা করতে চায়।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প আলোচনার ব্যাপারে আশাবাদী এবং পাকিস্তানে বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তবে এখনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি। তিনি আরও বলেন, ইরানের প্রধান লক্ষ্য হলো বোমা হামলা বন্ধ করা এবং যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দেখতে চায়, আগের আলোচনায় যেসব ছাড় দিতে ইরান রাজি ছিল না, এবার তারা সেগুলো দেবে কি না। দুই পক্ষই মনে রেখেছে, আগের আলোচনা কীভাবে শেষ হয়েছিল।