নেপালের রাজনীতিতে রীতিমতো বড় ভূমিকম্প ঘটে গেছে। গত বছরের জেন-জি বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, দমনপীড়ন ও অপরাধমূলক অবহেলার অভিযোগে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আজ শনিবার ভোরে কাঠমান্ডুর ভক্তপুরের নিজ নিজ বাসভবন থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এবং তাঁর মন্ত্রিসভা শপথ নেওয়ার ঠিক এক দিন পরেই এই নাটকীয় ঘটনা ঘটল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের পরই বিক্ষোভে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ নিয়ে তদন্ত শুরু হয় এবং পরে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।
গ্রেপ্তারের তালিকায় আছেন যাঁরা
নেপাল পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, এই দমনপীড়নের ঘটনায় জড়িত প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের এ-সংক্রান্ত কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী গ্রেপ্তার ও তদন্তের তালিকায় রয়েছেন:
গৌরী বাহাদুর কারকি কমিশনের সুপারিশ
সাবেক বিশেষ আদালতের বিচারক গৌরী বাহাদুর কারকির নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতেই এই অ্যাকশন শুরু হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, অলি এবং রমেশ লেখকসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা সম্ভাব্য সহিংসতা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য থাকা সত্ত্বেও তা দমনে চরম অবহেলা ও বেপরোয়া আচরণ করেছেন।
কমিশন তাঁদের বিরুদ্ধে জাতীয় দণ্ডবিধির ১৮১ ও ১৮২ ধারা অনুযায়ী ‘অপরাধমূলক অবহেলা’র অভিযোগে মামলা করার সুপারিশ করেছে। এই ধারায় দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান আইজিপি দান বাহাদুর কারকিসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে, যা তাঁদের পদোন্নতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
গ্রেপ্তারের প্রেক্ষাপট ও অভিযানের প্রস্তুতি
গতকাল শুক্রবার রাতে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয় এবং আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
শুক্রবার মধ্যরাত পর্যন্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে কাঠমান্ডু ভ্যালি এবং ভক্তপুর জেলা পুলিশের বিশেষ টিম গঠন করা হয়। আজ শনিবার সকালে অলিকে তাঁর গুন্ডুর বাসভবন থেকে এবং রমেশ লেখককে সূর্যবিনায়কের বাসভবন থেকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি ও জনজীবন
গত বছরের ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর নেপাল সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেন-জি প্রজন্মের তীব্র বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের গুলিতে অন্তত ৭৭ জন নিহত হন এবং বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ধ্বংস হয়। ওই রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর তীব্র জনরোষের মুখে অলি সরকারের পতন ঘটে।
আজকের এই হাই-প্রোফাইল গ্রেপ্তারের পর কাঠমান্ডু ভ্যালিজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। জেন-জি আন্দোলনের সমন্বয়কেরা এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও অলির সমর্থক মহলে উত্তেজনা বিরাজ করছে। আগামীকাল তাঁদের আদালতে তোলা হতে পারে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানানো হয়েছে।
তথ্যসূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট