ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের অন্তত ৫৫ হাজার সেনা যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছেন। তিনি জানান, নিহত সেনাদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সেনা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার জেলেনস্কি এই বক্তব্য দেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের চতুর্থ বার্ষিকীর প্রাক্কালে এই সংখ্যার কথা জানালেন তিনি। জেলেনস্কি যখন এই বক্তব্য দিচ্ছিলেন, ঠিক একই সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে যুদ্ধবিরতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছিল। আলোচনায় ইউক্রেন ও রাশিয়ার প্রতিনিধিরা ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় এই সংঘাতের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করছেন।
ফ্রান্সের টেলিভিশন চ্যানেল ফ্রান্স ২-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনে সরকারি হিসাবে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত সেনার সংখ্যা ৫৫ হাজার। তাঁদের মধ্যে পেশাদার সেনা যেমন আছেন, তেমনি বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া সদস্যরাও রয়েছেন।
ফরাসি ভাষায় অনূদিত ওই সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি আরও বলেন, নিহত সেনাদের বাইরে একটি ‘বড় সংখ্যা’ রয়েছে, যাঁদের সরকারিভাবে নিখোঁজ হিসেবে ধরা হচ্ছে। তবে নিখোঁজ সেনাদের সঠিক সংখ্যা তিনি জানাননি। এর আগে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেছিলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে ৪৬ হাজারের বেশি ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছেন।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) ২০২৫ সালের মাঝামাঝি জানিয়েছিল, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ৪ লাখ ইউক্রেনীয় সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন। গত মাসে জাতিসংঘের ইউক্রেন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশন জানায়, ২০২৫ সালে রুশ হামলায় ইউক্রেনে ২ হাজার ৫১৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১২ হাজার ১৪২ জন আহত হয়েছেন। এই সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি।
চলমান যুদ্ধে রাশিয়াও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। জানুয়ারিতে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর প্রধান ওলেকজান্দর সিরস্কি বলেন, শুধু ২০২৫ সালেই ইউক্রেনীয় বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার রুশ সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা গোয়েন্দাদের ২০২৫ সালের অক্টোবরের এক হিসাবে বলা হয়, পুরো যুদ্ধে রাশিয়ার মোট নিহত ও আহত সেনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ লাখ।
যুদ্ধের সময় ইউক্রেন ও রাশিয়া—দুই দেশই নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য খুব কম প্রকাশ করে। তবে তারা নিয়মিতভাবে প্রতিপক্ষের ক্ষতির হিসাব জানায়। বিশ্লেষকদের মতে, কিয়েভ ও মস্কো উভয়ই নিজেদের নিহতের সংখ্যা কম দেখায় এবং অপর পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে তুলে ধরে।
এদিকে গতকাল বুধবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, কিয়েভ এমন কিছু ‘সিদ্ধান্ত’ না নেওয়া পর্যন্ত রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, যা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে। অন্যদিকে আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় নতুন করে শুরু হওয়া আলোচনার প্রথম দিনকে ‘ফলপ্রসূ’ বলে মন্তব্য করেন ইউক্রেনের প্রধান আলোচক রুস্তেম উমেরভ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কিয়েভ ও মস্কো—দুই পক্ষকেই যুদ্ধ শেষ করতে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। তবে একাধিক দফা আলোচনা হলেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো অনেক দূরে। সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে, রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী ইউক্রেনকে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূমি ছেড়ে দেওয়া এবং ইউরোপের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র জাপোরিঝঝিয়ার ভবিষ্যৎ। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বর্তমানে রাশিয়া অধিকৃত ইউক্রেনীয় এলাকায় অবস্থিত।
মস্কো দাবি করেছে, যুদ্ধ শেষ করার যেকোনো চুক্তির শর্ত হিসেবে ইউক্রেনকে পুরো দনবাস অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি শক্তভাবে সুরক্ষিত শহর, যেগুলোকে রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের অন্যতম শক্ত প্রতিরক্ষা হিসেবে ধরা হয়। ইউক্রেন বলছে, বর্তমান ফ্রন্টলাইনের অবস্থানেই সংঘাত স্থগিত রাখা উচিত। তারা এখনো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো এলাকা থেকে একতরফাভাবে সেনা সরিয়ে নেওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
বর্তমানে রাশিয়ার বাহিনী ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড দখলে রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রিমিয়া এবং পূর্ব দনবাস অঞ্চলের অংশবিশেষ, যেগুলো ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের আগেই দখল করা হয়েছিল।