গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ইরানে এক নজিরবিহীন যৌথ হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র শুরুর দিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করতে ইসরায়েল ব্যবহার করে তাদের অন্যতম আধুনিক ও বিধ্বংসী অস্ত্র ‘ব্লু স্প্যারো’ ব্যালিস্টিক মিসাইল। এই ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষত্ব হলো—এটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ছেড়ে মহাকাশের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। ফলে এটি বর্তমান বিশ্বের যেকোনো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কাছে অপরাজেয়।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এই অভিযান পরিচালনার জন্য অত্যন্ত চতুর এক মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল। হামলার আগের দিন অর্থাৎ শুক্রবার ইসরায়েলি কর্মকর্তারা পরিকল্পিতভাবে ছুটির আমেজের আবহ তৈরি করেন। এমনকি আইডিএফের শীর্ষ কমান্ডাররা ‘সাব্বাত’ বা ছুটির ডিনারের জন্য বাড়িতে ফিরছেন—এমন তথ্য ও ছবিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে তেহরানের নীতিনির্ধারকেরা পরিবেশ নিরাপদ ভাবতে থাকেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁরা যুদ্ধের ময়দানে ফিরে আসেন।
পরদিন শনিবার সকালে তেহরানের সময় অনুযায়ী সকাল সাড়ে ৭টায় ইসরায়েলি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানগুলো আকাশপথে উড়াল দেয়। পরিকল্পনা ছিল রাতে হামলা করার, কিন্তু গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, শনিবার সকালে খামেনি তাঁর শীর্ষ সহযোগীদের নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসবেন। সেই সুযোগ নিতেই হামলার সময় পরিবর্তন করা হয়।
প্রায় ১ হাজার ২৪০ মাইল পাল্লার এই ‘ব্লু স্প্যারো’ মিসাইলগুলো সাধারণত যুদ্ধবিমান থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের পর এর বুস্টার রকেটগুলো মিসাইলটিকে সরাসরি বায়ুমণ্ডলের বাইরে মহাকাশের কাছাকাছি নিয়ে যায়। সেখান থেকে এটি অতি উচ্চগতিতে সরাসরি নিচের দিকে লক্ষ্যবস্তুর ওপর আছড়ে পড়ে। বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশের সময় এর গতি এত বেশি থাকে যে, ইরানের রাডার বা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা একে শনাক্ত বা প্রতিহত করার ন্যূনতম সময়টুকুও পায়নি।
হামলার সময় ইসরায়েল আরও একটি উন্নত কৌশল ব্যবহার করে। খামেনির কম্পাউন্ডের চারপাশের মোবাইল ফোন টাওয়ারগুলো সাময়িকভাবে বিকল করে দেওয়া হয়, যাতে তাঁর নিরাপত্তাকর্মীরা কোনো ধরনের আগাম সতর্কবার্তা আদান-প্রদান করতে না পারেন। প্রায় ৩০টি মিসাইলের একটি ঝাঁক খামেনির বাসভবন ও প্রশাসনিক কেন্দ্রে আঘাত হানে, এর মাত্রা এত তীব্র ছিল যে, পশ্চিম ইরাকেও ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে মাটির এত গভীরে নিয়ে গিয়েছিল যে, সাধারণ প্রচলিত অস্ত্র দিয়ে তা ধ্বংস করা সম্ভব ছিল না। এ ছাড়া ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎপাদনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ইসরায়েল এই ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এর মাধ্যমে মূল নেতৃত্বকে নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নেয়।