নজিরবিহীন তরুণ নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের প্রায় ছয় মাস পর দেশটিতে সাধারণ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। এই নির্বাচন বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত পুরোনো রাজনৈতিক শক্তি এবং একটি শক্তিশালী যুব আন্দোলনের মধ্যে এক উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
নির্বাচনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রয়েছেন পুনর্নির্বাচনপ্রত্যাশী সাবেক মার্ক্সবাদী প্রধানমন্ত্রী, তরুণদের ভোট আকর্ষণে সচেষ্ট র্যাপার থেকে মেয়রে পরিণত হওয়া নেতা এবং প্রভাবশালী নেপালি কংগ্রেস পার্টির নবনির্বাচিত প্রধান।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে দায়িত্ব পালন করা অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবর্তে কারা ক্ষমতায় আসবে, তা নির্ধারণ করবেন প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ভোটার। উল্লেখ্য, সেই অভ্যুত্থানে অন্তত ৭৭ জন নিহত হয়েছিলেন এবং সংসদ ভবনসহ বহু সরকারি দপ্তরে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ হিসেবে জেন-জি ব্যানারের অধীনে এই যুব আন্দোলন শুরু হলেও পরে দুর্নীতি এবং বিপর্যস্ত অর্থনীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক জনবিক্ষোভ একে পুষ্ট করে।
অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কারকি জনগণকে ‘কোনো ভয় ছাড়াই’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ভোটকেন্দ্রগুলোতে হাজার হাজার সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এই নির্বাচনে তরুণ প্রার্থীদের একটি জোয়ার দেখা গেছে, যাঁরা নেপালের নড়বড়ে অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তাঁরা সেসব অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের চ্যালেঞ্জ করছেন, যাঁরা কয়েক দশক ধরে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং দাবি করছেন যে তাঁদের অভিজ্ঞতাই কেবল স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। কাঠমান্ডুর ভোটার ৩৩ বছর বয়সী শশী গুরুং বলেন, ‘আমরা অনেক আশাবাদী। এটি কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়। এটি নেপালিদের এবং নেপালের জন্য অন্যতম একটি পরিবর্তনের মুহূর্ত হতে যাচ্ছে।’
মাউন্ট এভারেস্টসহ বিশ্বের ১০টি সর্বোচ্চ শৃঙ্গের ৮টির অবস্থান নেপালে। তুষারাবৃত এই পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে সবার নজর এখন রাজধানীর দক্ষিণের কৃষিপ্রধান সমতল ভূমির দিকে, যেখান থেকে তিন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা অতীতের রাজধানীকেন্দ্রিক নির্বাচনের তুলনায় একটি বড় পরিবর্তন।
সাধারণত শান্ত হিসেবে পরিচিত পূর্ব দিকের শহর ঝাপা এখন দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ৭৪ বছর বয়সী মার্ক্সবাদী নেতা কে পি শর্মা ওলি, যিনি গত বছর প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারিত হয়েছিলেন, তাঁর নিজ আসনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন ৩৫ বছর বয়সী র্যাপার-রাজনীতিবিদ এবং কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহর কাছে।
ঝাপা-৫ আসনে ভোটার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার। এখান থেকেই নির্ধারিত হবে ওলি তাঁর আসন রক্ষা করতে পারবেন কি না, নাকি বালেন্দ্র শাহ সংসদে প্রবেশ করবেন। মধ্যপন্থী রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) প্রার্থী শাহ নিজেকে তারুণ্যনির্ভর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং ভোটারদের পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দলীয় চিহ্ন ‘ঘণ্টা বাজানোর’ আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে আরও রয়েছেন ৪৯ বছর বয়সী গগন থাপা, যিনি দেশটির প্রাচীনতম দল নেপালি কংগ্রেসের নতুন প্রধান। তিনি এএফপিকে জানিয়েছেন, তিনি অভিজ্ঞ নেতাদের চক্রাকার শাসনের ‘পুরোনো যুগ’ বা ক্লাবের অবসান ঘটাতে চান।
ঝাপা জেলায় ভোট দিতে আসা ৫৭ বছর বয়সী শিব শ্রেষ্ঠ বলেন, ‘জেন-জিসহ বহু মানুষ তাদের জীবন উৎসর্গ করেছে। পরিবর্তন আসতেই হবে। দুর্নীতি বন্ধ হতে হবে এবং নেপালেই আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। গত বছর যা ঘটেছে তার পুনরাবৃত্তি হওয়া উচিত নয়।’
২৭৫ সদস্যের প্রতিনিধি সভার (পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ) ১৬৫টি সরাসরি নির্বাচিত আসনের জন্য ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি প্রার্থী লড়াই করছেন। বাকি ১১০টি আসন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে পূরণ করা হবে।
ভোট গ্রহণ শেষে ব্যালট বাক্স সংগ্রহ করা নেপালের পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাম প্রসাদ ভাণ্ডারী বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘ব্যালট সংগ্রহের জন্য আমরা হেলিকপ্টার ব্যবহার করব। বাক্সগুলো সংগ্রহের পর ভোট গণনা শুরু হলে সরাসরি নির্বাচনের ফলাফল ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রকাশ করব।’
তবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ফলাফল প্রকাশে আরও সময় লাগতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, কোনো একক দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। পূর্ণাঙ্গ ফলাফল আসতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে এবং কোয়ালিশন বা জোট সরকার গঠনের আলোচনা জটিল হলে তা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। ভোট গ্রহণ বিকেল ৫টায় শেষ হবে।