কাতার, তুরস্ক ও মিসরের মধ্যস্থতাকারীরা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আলোচনার জন্য একটি প্রস্তাবিত কাঠামো তুলে ধরেছেন। কাঠামোতে কয়েকটি মূলনীতির কথা বলা হয়েছে, যা চলতি সপ্তাহের শুক্রবার অনুষ্ঠেয় বৈঠকে আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে এ তথ্য জানিয়েছেন বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত দুটি সূত্র।
প্রস্তাবিত কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করতে সম্মত হবে। আলোচনার বিষয়গুলোর মধ্যে আরও আছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে বিধিনিষেধ এবং অঞ্চলে ইরানের মিত্রদের অস্ত্র সরবরাহে নিয়ন্ত্রণ। সূত্রগুলোর একজন একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক। আলোচনার সংবেদনশীলতার কারণে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
এদিকে এক ইরানি সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যে আলোচনায় অংশ নেওয়ার কথা, সেটি তুরস্কে নয়, ওমানে অনুষ্ঠিত হবে। আগে আলোচনা তুরস্কে হওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
এই কূটনৈতিক উদ্যোগ এমন এক সময়ে শুরু হচ্ছে, যখন ইরানের ওপর সম্ভাব্য মার্কিন হামলার আশঙ্কায় পুরো অঞ্চল উদ্বিগ্ন। গত মাসে ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংস দমন-পীড়নের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরব সাগরে মার্কিন সামরিক শক্তি জড়ো করার নির্দেশ দেন।
প্রস্তাবনায় কী আছে
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ইরান প্রথম তিন বছর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ রাখবে। এরপর তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ১ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে সীমিত রাখতে সম্মত হবে। ইরানের বর্তমান উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, যার মধ্যে প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা, তা একটি তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
এই প্রস্তাব শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যস্থতাকারীরা আরও প্রস্তাব দিয়েছেন, ইরান যেন অঞ্চলের তার অ-রাষ্ট্রীয় মিত্রদের কাছে অস্ত্র ও প্রযুক্তি হস্তান্তর না করে। এ ছাড়া এই কাঠামোর আওতায় ইরান প্রতিশ্রুতি দেবে যে তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সূচনা করবে না। তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সেই দাবির চেয়ে কম, যেখানে ওয়াশিংটন চেয়েছিল ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ও পাল্লা সীমিত করুক।
তিন মধ্যস্থতাকারীর প্রস্তাবনায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি ‘অ-আগ্রাসন চুক্তি’ করার কথাও রয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। এই প্রস্তাবিত কাঠামোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে—তা এখনো জানা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যেকোনো চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। এর আগে, ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতায় যেতে রাজি হয়েছিল। ২০১৫ সালে তারা যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে যৌথ ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা বা জেসিপিওএ চুক্তিতে সই করেছিল। ওই চুক্তির আওতায় নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করার কথা ছিল। কিন্তু তিন বছর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে বের করে নেন।
তবে এখন পর্যন্ত ইরান অঞ্চলজুড়ে তাদের অ-রাষ্ট্রীয় মিত্রদের প্রতি সমর্থন সীমিত করা বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কমানো নিয়ে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বুধবারও ইরান তাদের অবস্থানে অনড় ছিল। দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, তেহরান শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়েই আলোচনা করতে চায়।
কঠোর অবস্থান
মধ্যস্থতাকারীদের এই কাঠামো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কাছে উপস্থাপন করা হয়, তার ঠিক আগে স্টিভ উইটকফ ইসরায়েল সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র শক্ত অবস্থানে আছে। কারণ ইরান বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নানা চাপের মুখে।
আরব সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানবাহী রণতরী, যুদ্ধবিমান ও নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তেহরানের সামনে একটি বাস্তব সামরিক হুমকি তৈরি হয়েছে। একই সময়ে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ইরানে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়। এসব বিক্ষোভ কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয়। তবু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাসের কারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছাড় দিতে রাজি হবেন কি না, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকেরা সন্দিহান।
কূটনীতি পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও এটি প্রথম নয় যে দুই দেশের কর্মকর্তারা আলোচনায় বসেছেন। ১৯৮০ সাল থেকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। গত জুনে ওমানের রাজধানী মাসকাটে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা একটি পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু ইসরায়েলের ইরান বোমাবর্ষণের পর সেই আলোচনা থেমে যায়।
ইসরায়েলের ওই হামলা ১২ দিনের যুদ্ধের সূচনা করে। যুদ্ধের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়। জবাবে ইরান কাতারের আল উদেইদ সামরিক ঘাঁটিতে প্রতীকী হামলা করে। ওই ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা অবস্থান করে।
এরপর থেকে ইরান দাবি করেছে, তারা তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আবার পূরণ করেছে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, আক্রমণ করা হলে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে। কারণ ১২ দিনের যুদ্ধে কিছু ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের বহুল আলোচিত আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হয়েছিল।
এদিকে উত্তেজনা কমেনি। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করে, যা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরীর খুব কাছে চলে এসেছিল। একই দিনে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী ও মার্কিন নাবিক চালিত একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে হয়রানি করেছে। হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ।