৩ জানুয়ারি কারাকাসে নাটকীয় অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে আসার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। এর পরপরই তিনি গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার পুরোনো জেদ নতুন করে উসকে দিয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের পথে এগোয়, তাহলে তা কার্যত ন্যাটোর অবসান এবং ইউরোপের নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ সংকেত হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
মাদুরো আটক হওয়ার পরদিনই ট্রাম্প দ্য আটলান্টিককে বলেন, ‘আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার। কৌশলগত প্রতিরক্ষার জন্য এটি আমাদের প্রয়োজন।’ এরপর হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান স্টাফ স্টিফেন মিলার বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার বিষয়ে ভাবছে। এটি আমাদের সরকারি অবস্থান।’
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন ৪ জানুয়ারি দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্যকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি আরেকটি ন্যাটো দেশের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করে, তাহলে ন্যাটো আর কার্যকর থাকবে না।’
কারণ ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলা হলে সবাইকে একসঙ্গে প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হয়। এখন গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা হলে এই নীতিতে ন্যাটোর অন্য দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যেতে হবে। কিন্তু ইউরোপের কোনো দেশই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যেতে চায় না বা যাওয়ার সক্ষমতা রাখে না। এর মানে, ন্যাটোর চুক্তি উপেক্ষা করেই যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ড দখল করতে হবে। আর এমনটা হলে কার্যত ন্যাটোই আর থাকবে না।
আটলান্টিক কাউন্সিলের উত্তর ইউরোপবিষয়ক পরিচালক আন্না উইসলান্ডার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড দখল করে, তাহলে যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ন্যাটো অর্থহীন হয়ে পড়বে।’
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন মিয়ারশাইমার বলেন, ‘ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড দখলের ঘটনা একসঙ্গে ঘটলে তা ন্যাটোর জন্য মারাত্মক ধাক্কা হবে। জোটটি তখন শুধু নামেই থাকবে।’
তবে ইউরোপীয় নেতারা এখনো প্রকাশ্যে গ্রিনল্যান্ড বা ভেনেজুয়েলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনায় যাচ্ছেন না। তাঁদের প্রধান অগ্রাধিকার ইউক্রেন যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে রাখা।
চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক কিয়ার জাইলস মনে করেন, ইউরোপ আসলে সময় নিচ্ছে এবং ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে।
অন্যদিকে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। বড় শক্তিগুলো নিজেদের এলাকা মনে করে যা খুশি করতে পারে, এই ধারণা রাশিয়ার জন্য সুবিধাজনক।
এদিকে গত বুধবার জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যবস্থা ধ্বংস করছে। শক্তিশালী দেশগুলো মন চাইলেই যা খুশি দখল করে নেবে, বিশ্ব যেন এমন ডাকাতের আস্তানায় পরিণত না হয়।’
গ্রিনল্যান্ড রক্ষায় ইউরোপের কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে সম্ভাব্য সামরিক প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা শুরু করেছে। ফ্রান্স গত বছর যুক্তরাষ্ট্রকে পরোক্ষ বার্তা দিতে কানাডার উপকূলে একটি পারমাণবিক সাবমেরিন পাঠিয়েছিল। এ ছাড়া জার্মানি ও পোল্যান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিক্রিয়া জানানোর বিষয়েও ফ্রান্সের আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
কিন্তু গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি ট্রাম্পের সামরিক আগ্রাসন নাকি চাপের রাজনীতি? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলে সরাসরি সামরিক শক্তি ব্যবহার করবেন কি না, সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যদিও সামরিক বিকল্প উড়িয়ে দেননি। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ট্রাম্প প্রথমে চাপ, প্রলোভন ও অর্থনৈতিক প্রস্তাবের পথ বেছে নেবেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডবাসীকে মাথাপিছু ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ডলার দেওয়ার প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের।
গ্রিনল্যান্ড কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের পেছনে রয়েছে নিরাপত্তা, নতুন আর্কটিক নৌপথ এবং দুর্লভ খনিজ সম্পদ। বরফ গলার ফলে উত্তর মেরু অঞ্চলে বাণিজ্যিক ও সামরিক চলাচল বেড়েছে। এ ছাড়া বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা আসলে ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয় থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেওয়ার কৌশলের অংশ।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা