নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্সেস মেত্তে-মারিত আবারও এক গুরুতর বিতর্কের মুখে পড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সম্প্রতি জেফরি এপস্টেইন–সংক্রান্ত যে নথিগুলো অবমুক্ত করেছে, সেগুলোতে দেখা যাচ্ছে—বহু বছর ধরে এপস্টেইনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল নরওয়ের এই হবু রানির। শিশু যৌন অপরাধে দণ্ডিত ও পরে কারাগারে আত্মহত্যাকারী জেফরি এপস্টেইনের প্রকাশিত নথিতে প্রায় এক হাজারবার মেত্তে-মারিতের নাম উল্লেখ রয়েছে বলে জানিয়েছে নরওয়ের দৈনিক ভিজি।
নথি অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এপস্টেইনের সঙ্গে ইমেইলের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল প্রিন্সেস মেত্তে-মারিতের। এই সময়ের মধ্যে তাঁদের মধ্যে অসংখ্য ইমেইল আদান–প্রদান হয়েছে, যেগুলোর ভাষা বেশ ঘনিষ্ঠ বলেই নরওয়ের গণমাধ্যমগুলো উল্লেখ করছে। মেত্তে-মারিত ২০০১ সালে নরওয়ের ভবিষ্যৎ রাজা হাকোনকে বিয়ে করেন।
গোপন তথ্য ফাঁস হওয়ার পর এক বিবৃতিতে মেত্তে-মারিত এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন। রাজপ্রাসাদ থেকে দেওয়া ওই বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমি খুবই খারাপ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবং এপস্টেইনের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখার জন্য গভীরভাবে অনুতপ্ত। এটি নিঃসন্দেহে লজ্জাজনক।’
নথিতে থাকা ইমেইলগুলোতে দেখা যায়, এপস্টেইনের প্রতি মেত্তে-মারিতের বক্তব্য ছিল খুব ঘনিষ্ঠ ও আবেগপূর্ণ। এপস্টেইনকে এক ইমেইলে তিনি লিখেছেন, ‘তুমি আমার মাথা নষ্ট করে দাও।’ অন্য বার্তায় এপস্টেনকে ‘কোমল হৃদয়’ ও ‘সুইটহার্ট’ বলে সম্বোধন করেন মারিত। ২০১২ সালে এপস্টেইনকে ‘খুবই আকর্ষণীয়’ বলে বর্ণনা করেন তিনি। এমনকি এক ইমেইলে নিজের কিশোর বয়সী ছেলের কক্ষে ওয়ালপেপার কী হবে এপস্টেইনের কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘আমার ছেলের বয়স ১৫ বছর। ওর ঘরে কি দুজন নগ্ন নারীর ছবি রাখা যাবে?’ মারিতের সেই পুত্রের (মারিউস বর্গ হইবি) বিরুদ্ধেই এখন ধর্ষণের মামলা চলছে।
নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, ২০১৩ সালে ফ্লোরিডার পাম বিচে এপস্টেইনের বাড়িতে চার দিন অবস্থান করেছিলেন মেত্তে-মারিত। যদিও নথিতে নাম থাকা মানেই কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে—এমনটি নয় বলে স্পষ্ট করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্যের বিষয়ে নিজের বিবৃতিতে মেত্তে-মারিত বলেছেন, এপস্টেইনের ভুক্তভোগীদের প্রতি তাঁর গভীর সহমর্মিতা রয়েছে এবং তিনি স্বীকার করেন, এপস্টেইনের অতীত সম্পর্কে যথাযথভাবে খোঁজ না নেওয়ার দায় তাঁরই। এ ছাড়া নথিতে ২০১১ সালের একটি ইমেইলে দেখা যায়, তিনি এপস্টেইনকে জানিয়েছিলেন, গুগলে তাঁর বিষয়ে খোঁজ করে ‘ভালো কিছু দেখেননি’। এই ইমেইলটি বিতর্ককে আরও জটিল করেছে।
রাজপ্রাসাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০১৪ সালে এপস্টেইনের সঙ্গে লিখিত যোগাযোগ বন্ধ করেন মেত্তে-মারিত। কারণ তিনি মনে করেছিলেন, এপস্টেইন তাঁর রাজকীয় পরিচয়কে অন্যদের সঙ্গে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, এপস্টেইনের সঙ্গে মেত্তে-মারিতের সম্পর্কের তথ্য প্রকাশের সময়টি নরওয়ের রাজপরিবারের জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল। কারণ মঙ্গলবারই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে মেত্তে-মারিতের ছেলে মারিউস বর্গ হইবির ধর্ষণ মামলার বিচার। রাজপরিবারের বধূ হওয়ার আগের একটি সম্পর্ক থেকে হইবিকে জন্ম দিয়েছিলেন মেত্তে-মারিত। হইবির বিরুদ্ধে চার নারীকে ধর্ষণসহ মোট ৩৮টি অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে মারধর ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধও রয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর সর্বোচ্চ ১৬ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। তবে হইবি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ছেলের বিচার চলাকালে রাজদম্পতি আদালতে উপস্থিত থাকবেন না বলে জানানো হয়েছে। এই সময়ে মেত্তে-মারিত ব্যক্তিগত সফরে থাকবেন বলে জানান ক্রাউন প্রিন্স হাকোন। উল্লেখ্য, মারিউস হইবির কোনো রাজকীয় উপাধি নেই এবং তিনি সিংহাসনের উত্তরাধিকার তালিকায়ও অন্তর্ভুক্ত নন।
নরওয়ের হবু রানি মেত্তে-মারিতের জীবনকাহিনিও বেশ চমকে দেওয়ার মতো। দেশটির অতি সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। পরে তাঁর বাবা এক স্ট্রিপারকে বিয়ে করেন। দীর্ঘদিনের চেষ্টায় পড়াশোনা শেষ করেন মারিত। একজন ওয়েটার হিসাবে নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। বিয়ে না করেও জন্ম দিয়েছিলেন পুত্র হইবির। ‘পার্টি গার্ল’ হিসাবেই পরিচিত মেত্তে-মারিতের সঙ্গে ৯০ দশকের শেষদিকে আলাপ হয় নরওয়ের যুবরাজ হাকোনের।
২০০১ সালে নরওয়ের যুবরাজকে বিয়ে করেন মারিত। দুটি সন্তান রয়েছে তাঁদের। জানা গেছে, রাজপরিবারে বিয়ের বছর দশেক পর এপস্টেইনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় মারিতের।