হোম > বিশ্ব > আফ্রিকা

শান্তিতে নোবেল পাওয়া নাভি পিল্লাই সম্পর্কে যতদূর জানা যায়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট বিচারক ও মানবাধিকারকর্মী নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। ছবি: এএফপি

দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট বিচারক ও মানবাধিকারকর্মী নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই এবার (২০২৬ সাল) নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় কয়েক দশকের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) পুরস্কার ঘোষণার সময় নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি তাঁর কাজের ক্ষেত্রে ‘বিচারিক কঠোরতা, ব্যক্তিগত সততা ও অসাধারণ সাহসের’ প্রশংসা করে।

১৯৪০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল প্রদেশের ডারবানে জন্ম নেওয়া পিল্লাই তামিল বংশোদ্ভূত। বর্ণবৈষম্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা এই আইনজীবী কর্মজীবনের শুরু থেকেই মানবাধিকার রক্ষায় সক্রিয় ছিলেন। ইউনিভার্সিটি অব নাটাল থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ওই প্রদেশের প্রথম নারী হিসেবে নিজস্ব আইন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের একাধিক কর্মীর পক্ষে আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন তিনি।

১৯৭৩ সালে রবেন দ্বীপে বন্দী রাজনৈতিক বন্দীদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন পিল্লাই। ওই দ্বীপের কারাগারেই দীর্ঘদিন বন্দী ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। রাজনৈতিক বন্দীদের আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।

পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী হন পিল্লাই। এরপর তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডার (আইসিটিআর) সভাপতিত্ব করেন। ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডার গণহত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিচারে এ ট্রাইব্যুনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নোবেল কমিটির মতে, রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়ায় পিল্লাইয়ের অবদান আন্তর্জাতিক আইনে গুরুত্বপূর্ণ নজির প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। বিশেষ করে, ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাও মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অংশ হতে পারে—এ স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। গণহত্যায় উসকানির অভিযোগে প্রচারণা ছড়ানোর দায়ে কোনো আসামির বিচারের ক্ষেত্রেও ওই ট্রাইব্যুনালে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে।

২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পিল্লাই। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেন। কমিশন ২০২৫ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর পিল্লাই গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। এ অভিযোগ ও মূল্যায়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক রয়েছে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পিল্লাই। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলার বিচারপ্রক্রিয়াতেও তিনি যুক্ত রয়েছেন।

নোবেল কমিটি বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষায় তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ। কমিটির মতে, আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে, তখন পিল্লাইকে সম্মানিত করার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ফলকার তুর্ক পুরস্কারটিকে মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের প্রতি স্বীকৃতি হিসেবে অভিহিত করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা পিল্লাইয়ের সাহস, সততা ও আজীবন ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থানের প্রশংসা করেছেন।

পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় পিল্লাই বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধের শিকার ও বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের জন্য তিনি এ সম্মান উৎসর্গ করতে চান। তিনি আরও বলেন, আইনের শাসন, স্বাধীন আদালত এবং নীতিনির্ভর আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা রক্ষায় সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানোর প্রত্যয় এ পুরস্কারকে আরও দৃঢ় করেছে।