হোম > স্বাস্থ্য > স্বাস্থ্য-গবেষণা

অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণকালে চিনি খেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অন্ত্রের উপকারী অণুজীব

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণকালে চিনিযুক্ত খাবারে মানুষের অন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ছবি: ম্যাগনিফিক

অ্যান্টিবায়োটিক চলাকালে চিনিযুক্ত খাবার গ্রহণ করলে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম বা অণুজীবের বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এর ফলে বিভিন্ন রোগের বিপজ্জনক সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এমনটাই উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

গত বুধবার নেচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার সময় মিষ্টি ও চিনিযুক্ত খাবারের পরিমাণ বাড়লে অন্ত্রের উপকারী ও ক্ষতিকর জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। বিশেষ করে চিনিযুক্ত খাবার এ ক্ষেত্রে বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান কেটেরিং ক্যানসার সেন্টার নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি অব ল্যাঙোন হেলথ এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের সিটি অব হোপ ক্যানসার সেন্টার গবেষকেরা। গবেষণায় ক্যানসার আক্রান্ত ১৭৩ জন রোগীর কাছ থেকে সংগ্রহ করা ১ হাজারের বেশি মলের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। এসব রোগী স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের আগে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা নিয়েছিলেন। তাঁরা হাসপাতাল থেকে প্রস্তুত করা ৯ হাজার ৪০০টির বেশি খাবার গ্রহণ করেছিলেন।

হাসপাতালের খাবার হওয়ায় গবেষকেরা রোগীরা ঠিক কী এবং কত পরিমাণ খাবার খেয়েছেন, তা নির্ভুলভাবে জানতে পেরেছেন। গবেষকদের মতে, পুষ্টিবিষয়ক গবেষণায় এটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা, কারণ সাধারণত গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন আগে কী খেয়েছেন তা মনে করে জানাতে হয়।

মানুষের অন্ত্রে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও অন্যান্য অণুজীবের সমষ্টিকে গাট মাইক্রোবায়োম বলা হয়। এগুলো হজমে সহায়তা, প্রয়োজনীয় ভিটামিন তৈরি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। মাইক্রোবায়োম মস্তিষ্কের সঙ্গেও যোগাযোগ করে এবং ঘুম, মেজাজ ও মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত সেরোটোনিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটার তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

গবেষণায় দেখা যায়, খাদ্যাভ্যাস অন্ত্রের জীবাণুর সংখ্যা ও বৈচিত্র্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। উদ্ভিদজাত, বৈচিত্র্যময় ও ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া মানুষের অন্ত্রে সাধারণত জীবাণুর বৈচিত্র্য বেশি থাকে। বিপরীতে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খেলে এই বৈচিত্র্য কমতে পারে।

গবেষকদের মতে, অন্ত্রে বৈচিত্র্যময় জীবাণুর এক শক্তিশালী সম্প্রদায় ক্ষতিকর প্যাথোবায়োন্ট বা রোগসৃষ্টিকারী জীবাণুর অতিরিক্ত বৃদ্ধি ঠেকাতে সাহায্য করে। গবেষণার অন্যতম লেখক জোনাথন পেলেড বলেন, এই গবেষণার বিশেষত্ব হলো ক্যানসার চিকিৎসার কারণে রোগীদের মাইক্রোবায়োম এবং পুষ্টিগত অবস্থা একই সময়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। গবেষকেরা চর্বি, কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবারের মতো মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের (যেমন—শর্করা, আমিষ ও চর্বি) সঙ্গে বিভিন্ন অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। পাশাপাশি মুরগি, আপেল ও চকলেট কেকের মতো নির্দিষ্ট খাবারের প্রভাবও পরীক্ষা করা হয়।

পেলেডের মতে, বিশ্লেষণে বারবার যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা হলো—মানুষ যত বেশি চিনিযুক্ত খাবার খায়, অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে তার ক্ষতিকর প্রভাব তত বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে খাবারে যোগ করা চিনির প্রভাব ছিল বেশি ক্ষতিকর। গবেষণায় দেখা যায়, অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের সময় প্রতি সাড়ে তিন আউন্স বা প্রায় ৯৯ গ্রাম অতিরিক্ত মিষ্টি বা চিনিযুক্ত খাবার খাওয়ার সঙ্গে মল নমুনায় মাপা মাইক্রোবায়োমের বৈচিত্র্য প্রায় ২৪ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।

অন্যদিকে রোগীর অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা যত বেশি তীব্র হয়েছে, তার অন্ত্রের জীবাণুর বৈচিত্র্য তত বেশি কমেছে। মাইক্রোবায়োমের এই পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার দ্রুত বৃদ্ধির সম্পর্কও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে (এন্টারোকক্কাস faecium) এন্টারোকক্কাস ফেসিয়াম। এন্টারোকক্কাস সাধারণ অবস্থায় অন্ত্রে ক্ষতি না করেই থাকতে পারে এবং অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে এর সংখ্যা নিয়ন্ত্রিত থাকে। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে অন্য ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হলে এন্টারোকক্কাস অতিরিক্ত বেড়ে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি অন্ত্রের দেয়াল অতিক্রম করে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে সেপসিস বা মারাত্মক সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে।

পেলেড বলেন, বিশেষ করে অস্থিমজ্জা বা বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে এন্টারোকক্কাস প্রতিস্থাপন-পরবর্তী কিছু জটিলতা আরও গুরুতর করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রাফট ভার্সাস হোস্ট ডিজিজ (graft-versus-host disease–GVHD) ; এই অবস্থায় দাতার কাছ থেকে পাওয়া স্টেম সেল রোগীর শরীরকে বিদেশি হিসেবে শনাক্ত করে এবং সুস্থ টিস্যুতে আক্রমণ শুরু করে।

গবেষকেরা মানুষের ওপর পাওয়া ফল ইঁদুরের ক্ষেত্রেও পুনরায় তৈরি করা যায় কি না, তা পরীক্ষা করেন। ইঁদুরকে একটি অ্যান্টিবায়োটিকের একবারের ইনজেকশন দেওয়ার পর এন্টারোকক্কাসের সংখ্যা সামান্য বাড়ে। এরপর অ্যান্টিবায়োটিকের পাশাপাশি ইঁদুরকে চিনিযুক্ত খাবার দেওয়া হলে তৃতীয় দিনে এন্টারোকক্কাসের পরিমাণ ১৬ গুণ এবং ষষ্ঠ দিনে ৩৩ গুণ বেড়ে যায়।

গবেষণায় এই পরিবর্তনের সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকিরও সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গড়ের তুলনায় বেশি চিনি খাওয়া রোগীদের স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের পর মৃত্যুর ঝুঁকি কম চিনি খাওয়া রোগীদের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি ছিল। গবেষকেরা এটিকে ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ঝুঁকি বৃদ্ধি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পেলেড বলেন, এটি রোগীদের সামগ্রিক ঝুঁকির মাত্রায় একটি ‘মাঝারি পরিবর্তন।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার পর এন্টারোকক্কাসের অতিরিক্ত বৃদ্ধি প্রায় আট দিন স্থায়ী হয়েছিল। গবেষণায় অংশ না নেওয়া অ্যান্থনি মারেসো গবেষণাটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, গবেষণাটি চিকিৎসা ও গবেষণা মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করতে পারে। মারেসো বলেন, স্টেম সেল প্রতিস্থাপন নেওয়া রোগীদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হাসপাতালের চিকিৎসাধীন এসব রোগীর ক্ষেত্রে অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো সংক্রমণ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, হাসপাতালের রোগীদের খাদ্যতালিকা পরিবর্তন করা উচিত কি না।

অ্যান্থনি মারেসো আরও প্রশ্ন করেন, হাসপাতালের বাইরে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণকারী মানুষের ক্ষেত্রেও একই ফল প্রযোজ্য কি না। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানতে চান, কানের সংক্রমণের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়ার সময় কেউ যদি বেশি চিনি খান, তাহলে তা পরবর্তী সময়ে অন্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায় কি না।

গবেষণাটি চিনি, অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের পরিবর্তনের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্কের ইঙ্গিত দিলেও, এটিকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্কের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। পেলেড বলেন, সাধারণভাবেই অতিরিক্ত চিনি খাওয়া এড়িয়ে চলা ভালো। তাই অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার সময় চিনি কমিয়ে দেওয়া অযৌক্তিক নয়। তবে তাঁর মতে, গবেষণার ফল থেকে অ্যান্টিবায়োটিক চলাকালীন পুরো সময় মিষ্টি বা চিনিযুক্ত খাবার সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হয়নি।

বরং গবেষণাটি যে বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করছে তা হলো—বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের সময় চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয়ের পরিমাণ সীমিত রাখা যেতে পারে।