কিডনি আমাদের শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। রক্ত থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি অপসারণ, শরীরের লবণ ও খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে কিডনি। কিন্তু বিভিন্ন কারণে দীর্ঘ সময় ধরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমতে থাকলে তাকে বলা হয় ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা সংক্ষেপে সিকেডি। বাংলা তাকে বলা হয় দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ।
এ রোগের অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক রোগীর কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। ফলে তাঁরা এ রোগ সম্পর্কে তখনই জানতে পারেন, যখন কিডনির কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ সিকেডির অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া দীর্ঘদিনের কিডনি প্রদাহ, কিছু বংশগত কিডনি রোগ, বারবার কিডনি সংক্রমণ, কিডনিতে পাথরজনিত জটিলতা এবং কিছু ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কিডনির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ বা পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পা বা মুখ ফুলে যাওয়া, প্রস্রাবের পরিমাণ বা ধরনে পরিবর্তন, প্রস্রাবে ফেনা বা রক্ত, অতিরিক্ত ক্লান্তি, ক্ষুধামান্দ্য, বমি ভাব, চুলকানি, ঘুমের সমস্যা এবং শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে শুধু উপসর্গের ওপর নির্ভর করে সিকেডি শনাক্ত করা যায় না। এ জন্য নিয়মিত পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত ও প্রস্রাবের কিছু পরীক্ষা করাতে হয়। রক্তে সেরাম ক্রিয়েটিনিন ও ইজিএফআর এবং প্রস্রাবে অ্যালবুমিন বা প্রোটিন পরীক্ষা কিডনির কার্যক্ষমতা ও ক্ষতি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। প্রয়োজনে কিডনির আল্ট্রাসনোগ্রামসহ অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে।
সব ধরনের সিকেডি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে ঝুঁকি কমানো এবং রোগের অগ্রগতি ধীর করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব। এর জন্য ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান এড়ানো, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশকসহ কোনো ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার না করা গুরুত্বপূর্ণ। কিডনি রোগে সবার জন্য একই ধরনের খাবার বা পানি গ্রহণের পরিমাণ প্রযোজ্য নয়। রোগের পর্যায় ও অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসক ও ডায়েটিশিয়ান খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণ করতে পারেন।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, প্রস্রাবে প্রোটিন বা রক্ত, কিডনি পরীক্ষার অস্বাভাবিক ফল, বারবার কিডনি সমস্যা অথবা পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস থাকলে নেফ্রোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সিকেডি যত দ্রুত শনাক্ত করা যায়, তত দ্রুত ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করে কিডনির অবশিষ্ট কার্যক্ষমতা রক্ষার সুযোগ তৈরি হয়।
কিডনি রোগের ক্ষেত্রে অপেক্ষা না করে সচেতন হোন, নিয়মিত পরীক্ষা করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিন।
চিকিৎসকের পরামর্শ: ডা. শওকত আজাদ, কনসালটেন্ট, নেফ্রোলজি
এভারকেয়ার হাসপাতাল, চট্টগ্রাম