হোম > স্বাস্থ্য

সরকারের অক্সিজেন প্ল্যান্টের ৮৭ শতাংশ সেবার বাইরে

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

ফাইল ছবি

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকার ও দাতা সংস্থার অর্থায়নে ৯৯টি মেডিকেল অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন করা হলেও সিংহভাগই এখন রোগীদের কাজে আসছে না। বিশেষ করে বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্থাপন করা ৭০টি প্ল্যান্টের ৮৭ দশমিক ১৪ শতাংশই (৬১টি) সেবার বাইরে।

রাজধানীর ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে (আইইউবি) আজ শনিবার শুরু হওয়া ‘বাংলাদেশ অক্সিজেন সামিট ২০২৬’-এর প্রথম দিনে উপস্থাপিত এক পর্যালোচনায় সরকারি হাসপাতালের অক্সিজেন ব্যবস্থার এই চিত্র উঠে এসেছে।

দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ অক্সিজেন সামিট ২০২৬’-এর আয়োজন করেছে বাংলাদেশ অক্সিজেন নেটওয়ার্ক ও আইইউবি বাংলাদেশের সহযোগিতায় সিএইচআইপিএস। আজ প্রথম দিনে অক্সিজেনের চাহিদা ও সরবরাহ, উৎপাদন, অবকাঠামো, মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। আগামীকাল রোববার সমাপনী অধিবেশনে নীতি সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে।

সামিটে ‘ফ্রম অক্সিজেন প্ল্যান্টস টু রিলায়েবল অ্যাকসেস’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনাইটেড নেশনস অফিস ফর প্রজেক্ট সার্ভিসেসের (ইউএনওপিএস) বাংলাদেশের সিনিয়র অ্যানালিস্ট মারুফ হাসান।

তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলা হাসপাতাল, ২৮টি বিশেষায়িত হাসপাতাল ও ৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৯৯টি প্রেশার সুইং অ্যাডসর্পশন (পিএসএ) ও ভ্যাকিউম সুইং অ্যাডসর্পশন (ভিএসএ) অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের রাজস্ব খাতের ৪০টি এবং এডিবির ঋণে ৩০টি—মোট ৭০টি প্ল্যান্ট সিএমএসডির মাধ্যমে ঠিকাদারদের দিয়ে স্থাপন করা হয়। সিএমএসডির ৭০টি প্ল্যান্টের মধ্যে ৩১টি কারিগরিভাবে নষ্ট বা ত্রুটিযুক্ত হয়ে পুরোপুরি অচল। আরও ৩০টি কারিগরিভাবে সচল বা ‘ফাংশনাল’ হলেও সার্বক্ষণিক চালু বা ‘অপারেশনাল’ নেই। ফলে চালু রয়েছে ৯টি (১৩ শতাংশ)। বিপরীতে গ্লোবাল ফান্ডের অনুদানে ইউএনওপিএস সরকারি হাসপাতালে সরাসরি নকশা, নির্মাণ ও চালুর দায়িত্ব নিয়ে স্থাপন করা ২৯টি প্ল্যান্টের সব কটিই বর্তমানে ফাংশনাল ও সার্বক্ষণিক অপারেশনাল রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সিএমএসডির অধীনে থাকা সাতটি প্ল্যান্ট এখনো হাসপাতালের কেন্দ্রীয় অক্সিজেন পাইপলাইনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। স্থায়ী বাজেট ও কারিগরি টেকনিশিয়ান না থাকায় কোথাও সাধারণ কর্মচারীদের দিয়ে প্ল্যান্ট পরিচালনা করা হচ্ছে, যা দিনে কয়েক ঘণ্টার বেশি সম্ভব নয়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে উৎপাদিত অক্সিজেনের পিউরিটিও চিকিৎসায় ব্যবহারের উপযোগী মাত্রার নিচে নেমে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, একদিকে সিএমএসডির প্ল্যান্টগুলো অচল হয়ে পড়ে আছে, অন্যদিকে গ্লোবাল ফান্ডের অনুদানে ইউএনওপিএসের তৈরি সচল ২৯টি প্ল্যান্টের টেকনিশিয়ানদের বেতনের অনুদান চুক্তি গত ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তার মেয়াদ শেষ হবে ৩১ ডিসেম্বর। সরকার দ্রুত এসব প্ল্যান্টের কারিগরি জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব না নিলে এবং নিজস্ব ৬১টি প্ল্যান্ট মেরামত না করলে সরকারি হাসপাতালের অক্সিজেন অবকাঠামো বড় সংকটে পড়তে পারে।

অধিবেশনে ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশন অন মেডিকেল অক্সিজেন সিকিউরিটির কো-চেয়ার ও আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী ড. আহমেদ এহসানুর রহমান গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ (জিবিডি)-এর হিসাব তুলে ধরে জানান, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ মানুষের চিকিৎসায় অক্সিজেন প্রয়োজন। এর মধ্যে অস্ত্রোপচারে ৫৪ লাখ, তীব্র রোগে ১৯ লাখ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে ২ লাখ মানুষের অক্সিজেন লাগে। জিবিডি ২০২৩-এর তথ্যের ভিত্তিতে এ হিসাব করা হয়েছে।

তীব্র রোগের মধ্যে নিম্ন শ্বাসনালির সংক্রমণ, হৃদ্‌রোগ, আঘাত, সেপসিস, অপরিণত জন্ম, ডায়রিয়া, হাম-হুপিং কাশি ও ডেঙ্গুতে অক্সিজেনের চাহিদা বেশি। এ ছাড়া হাঁপানি, যক্ষ্মা, এনকেফেলাইটিস, টাইফয়েড, মেনিনজাইটিস ও ম্যালেরিয়াতেও অক্সিজেন প্রয়োজন হতে পারে। হাসপাতালে ভর্তি ২৪ শতাংশ নবজাতক, ১২ শতাংশ শিশু ও ১১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কের হাইপোক্সেমিয়া থাকে; এ অবস্থায় মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।

বিশ্বে বছরে প্রায় ৩৮ কোটি ৭৮ লাখ মানুষের চিকিৎসায় অক্সিজেন প্রয়োজন। জিবিডি ২০২১-এর তুলনায় নতুন হিসাবে এ সংখ্যা বেড়েছে ১ কোটি ৪২ লাখ। এর মধ্যে তীব্র রোগে ১১ কোটি ৩১ লাখ, অস্ত্রোপচারে ২৬ কোটি ৫৩ লাখ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে ৯৩ লাখ মানুষের অক্সিজেন লাগে। অস্ত্রোপচারের আগে, সময় ও পরে এবং দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগীদের চিকিৎসাতেও অক্সিজেন প্রয়োজন হয়।

সামিটে নতুন হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা ও প্রাক্কলন অনুমোদনের সময় অক্সিজেন প্ল্যান্ট, কেন্দ্রীয় পাইপলাইন, পর্যাপ্ত অপারেটর ও বিদ্যুৎ ব্যাকআপের বাজেট রাখার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে সারা দেশের প্ল্যান্টের কার্যকারিতা ও অক্সিজেনের মান কেন্দ্রীয়ভাবে তদারকির জন্য জাতীয় ড্যাশবোর্ড তৈরির তাগিদ দেওয়া হয়।

সকালের অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য দেন ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) সেন্টার ফর হেলথ ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যান্ড পলিসি সায়েন্সেসের (সিএইচআইপিএস) পরিচালক ড. এস এম মোয়াজ্জেম হোসেন।

অধিবেশনের সভাপতি ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘অক্সিজেনের মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা, কার্যকর অপারেশন-রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়মিত মনিটরিং ও ইভালুয়েশন জরুরি। প্রকল্পের শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সম্পৃক্ত করে বায়োমেডিক্যাল, সিভিল ও ফার্মাসিউটিক্যাল বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কারিগরি সাবকমিটি গঠন করে নকশা ও নির্মাণ যাচাই করা প্রয়োজন।

আলমগীর হোসেন বলেন, ‘অক্সিজেনের কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনক্সাইড, আর্দ্রতাসহ বিভিন্ন ইমপিউরিটি নির্ধারিত মাত্রায় আছে কি না, তা কঠোরভাবে পরীক্ষা করতে হবে। উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনগত ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় এনে ২০২৩ সালের ঔষধ ও কসমেটিকস আইনসহ বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেই নিজের মান যাচাই করলে স্বার্থের সংঘাতের সুযোগ থাকে।’

হাসপাতালের অক্সিজেন পাইপলাইনকে বিশেষায়িত অবকাঠামো উল্লেখ করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘এটি সাধারণ সিভিল ওয়ার্ক নয়; নকশা, নির্মাণ ও তদারকিতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যুক্ত করতে হবে। দেশে আটটি প্রতিষ্ঠান অক্সিজেন উৎপাদনের লাইসেন্স নিয়েছে; মানের কারণে একটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স/উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে।’

অধিবেশনের কো-চেয়ার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লাও বক্তব্য দেন।

অধিবেশনে ঔষধ প্রশাসনের পরিচালক ও জাতীয় ফার্মাকোভিজিলেন্স সেন্টারের প্রধান ড. আকতার হোসেন নিরাপদ মেডিকেল অক্সিজেন ও যন্ত্রপাতির নিবন্ধন-তদারকিতে ঔষধ প্রশাসনের ভূমিকা তুলে ধরেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গবেষণা কর্মকর্তা ডা. মো. আলী সাইফুল্লাহ সজীব অন-সাইট মেডিকেল অক্সিজেন উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেন। লিনডে বাংলাদেশ, স্পেকটা অক্সিজেন ও আবুল খায়ের গ্রুপের প্রতিনিধিরা উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহ ও নিরাপত্তা নিয়ে বক্তব্য দেন। ইউনিসেফের ডা. টেন চো ও ডা. হোসাইন আহমেদ মা, নবজাতক ও শিশুর জরুরি চিকিৎসায় অক্সিজেনের প্রাপ্যতা ও মান নিয়ে আলোচনা করেন। নিমো অ্যান্ড টিসির প্রকৌশলী অপু সিকদার অক্সিজেন অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বক্তব্য দেন।

ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির ড. সোরাইয়া জেমি জানান, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঝিনাইদহের একটি জেলা ও কয়েকটি উপজেলা হাসপাতালে অক্সিজেনের প্রাপ্যতা ও সরবরাহ ঘাটতি নিয়ে গবেষণা করা হবে। এসব তথ্য জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে কীভাবে পৌঁছায়, তাও দেখা হবে।