হোম > স্বাস্থ্য > চিকিৎসকের পরামর্শ

হাম থেকে মুক্ত থাকতে জানতে হবে যেসব বিষয়

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 

হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসবাহিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসপ্রশ্বাস, কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে এটি সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগের কারণে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা এবং এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। যেকোনো বয়সের মানুষ হামে আক্রান্ত হলেও শিশুদের মধ্যে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এ রোগের জীবাণু প্রথমে শ্বাসনালি আক্রান্ত করে। তারপর পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রচণ্ড জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং পুরো শরীরে ফুসকুড়ি ওঠা।

হাম থেকে মুক্ত থাকার সেরা উপায় টিকা নেওয়া। এই টিকা নিরাপদ এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে। ১৯৬৩ সালে হামের টিকার প্রবর্তন হয়। এর আগে দুই থেকে তিন বছর পরপর এ রোগের কারণে মহামারি ঘটত। সে সব মহামারিতে ব্যাপকসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হতো।

২০২৪ সালে হামের কারণে আনুমানিক ৯৫ হাজার মানুষ মারা গেছে। মৃতদের মধ্যে অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। বিশ্বব্যাপী ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ২০০০ সালের ৭ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২০২৪ সালে ৯৫ হাজারে নামিয়েছে।

লক্ষণ এবং উপসর্গ

হামের লক্ষণ সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের ১০-১৪ দিন পর শুরু হয়। এর দৃশ্যমান লক্ষণ হলো শরীরে ফুসকুড়ি। এর প্রাথমিক লক্ষণ সাধারণত ৪ থেকে ৭ দিন স্থায়ী হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • নাক দিয়ে পানি পড়া
  • কাশি
  • চোখ লাল হওয়া এবং পানি পড়া
  • গালের ভেতরে ছোট সাদা দাগ। এগুলো ফুসকুড়ি সংস্পর্শের ৭-১৮ দিন পর শুরু হয় সাধারণত মুখ এবং গলার ওপরের অংশে। এটি প্রায় তিন দিনে ছড়িয়ে হাত এবং পায়ে পৌঁছে। এগুলো সাধারণত ৫ থেকে ৬ দিন স্থায়ী হয়ে মিলিয়ে যায়।

হামের অধিকাংশ মৃত্যু হয় রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত জটিলতার কারণে। এ জটিলতাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • অন্ধত্ব
  • এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের ফোলা ভাব সৃষ্টিকারী সংক্রমণ, যা মস্তিষ্কের ক্ষতির কারণ হতে পারে
  • গুরুতর ডায়রিয়া এবং পানিশূন্যতা
  • কানের সংক্রমণ
  • গুরুতর শ্বাসকষ্টসহ নিউমোনিয়া।

যদি কোনো গর্ভবতী হামে আক্রান্ত হন, তাহলে এটি মা এবং শিশুর জন্য বিপজ্জনক হতে পারে এবং কম ওজনসহ অকালে শিশু জন্মাতে পারে।

পাঁচ বছরের নিচের শিশু এবং ৩০ বছরের ওপরের বয়স্ক মানুষদের জটিলতা সবচেয়ে বেশি। ভিটামিন এ-এর অভাবে ভোগা শিশু এবং এইচআইভি বা অন্যান্য রোগের কারণে দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশুদের মধ্যে জটিলতার হার বেশি। এ ছাড়া হামের ভাইরাস নিজেও মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে বলে এ রোগ শিশুদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

কারা ঝুঁকিতে আছে?

  • যেকোনো দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ এতে আক্রান্ত হতে পারে।
  • টিকা না দেওয়া শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এবং টিকা দেওয়া কিন্তু কম রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষও এতে আক্রান্ত হতে পারে।
  • টিকা না দেওয়া শিশু এবং গর্ভবতীরা গুরুতর হামের জটিলতার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ যেকোনো কারণে স্বাস্থ্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হলে এবং আবাসিক ক্যাম্পসহ যেকোনো ভিড় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। অপুষ্টিতে ভোগা বা অন্যান্য কারণে দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশুরা হামের কারণে মৃত্যুর সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।

সংক্রমণ

হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। এটি আক্রান্ত মানুষের কাশি, হাঁচি বা হাম আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসপ্রশ্বাস বাতাসের সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। ভাইরাস বাতাসে বা আক্রান্ত পৃষ্ঠে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় এবং সংক্রামক থাকে। হামে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি ১৮টি পর্যায়ক্রমিক সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে।

ফুসকুড়ি শুরুর চার দিন আগে থেকে ফুসকুড়ি হওয়ার চার দিন পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যকে সহজে সংক্রমিত করতে পারে।

হামের মহামারি গুরুতর জটিলতা এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে, বিশেষ করে কম বয়সী ও অপুষ্টির শিকার শিশুদের জন্য।

চিকিৎসা

  • হামের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। লক্ষণ উপশমে যত্ন দেওয়া, আক্রান্ত ব্যক্তিকে আরামে রাখা এবং জটিলতা প্রতিরোধে লক্ষ্য থাকে এর চিকিৎসার ক্ষেত্রে।
  • পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং ডায়রিয়া বা বমির কারণে হারানো তরল পূরণের চিকিৎসা অর্থাৎ পানিশূন্যতা প্রতিরোধ করা এ রোগের জন্য জরুরি। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
  • চিকিৎসকেরা নিউমোনিয়া এবং কান ও চোখের সংক্রমণ চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে পারেন।
  • হামে আক্রান্ত শিশু বা প্রাপ্তবয়স্কদের ২৪ ঘণ্টা ব্যবধানে দুটি ডোজ ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া উচিত। এটি চোখের ক্ষতি এবং অন্ধত্ব প্রতিরোধ করে। ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট হামে মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে পারে।

প্রতিরোধ

  • সর্বজনীন টিকাকরণ হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সব শিশুকে হামের টিকা দেওয়া উচিত।
  • শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত করতে টিকার দুটি ডোজ নিতে হবে। যেসব দেশে হাম বেশি হওয়ার প্রবণতা আছে, সেসব দেশে সাধারণত শিশুর ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং অন্যান্য দেশে ১২ থেকে ১৫ মাসে প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় সাধারণত ১৫ থেকে ১৮ মাসে।
  • হামের টিকা আলাদাভাবে দেওয়া যায়। আবার এটি মাম্পস, রুবেলা এবং ভ্যারিসেলার টিকার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।
  • রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে নিয়মিত এবং অন্যান্য রোগের চিকিৎসা করাতে হবে ঠিকমতো।
  • ফুসকুড়ি প্রথম দেখা যাওয়ার দিন থেকে কমপক্ষে চার দিন নার্সারি, স্কুল বা কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে থাকতে হবে।
  • শিশু, গর্ভবতী বা দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের থেকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দূরে থাকতে হবে, যেন অন্যরা আক্রান্ত না হয়ে যায়।

আক্রান্তের যত্নে যা করতে হবে

হাম সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যে ভালো হতে শুরু করে। চিকিৎসক দেখানোর পর, লক্ষণগুলো কমাতে এবং সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে আপনি কিছু কাজ করতে পারেন।

আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিশ্রামে রাখুন এবং পানিশূন্যতা কমাতে পানিসহ প্রচুর তরলজাতীয় খাবার দিন।

যদি আপনার শিশু অস্বস্তিকর অবস্থায় থাকে বা কষ্ট পায় তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধের ব্যবস্থা করুন যত দ্রুত সম্ভব।

প্রাপ্তবয়স্করা জ্বর কমাতে জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খেতে পারেন।

আপনার বা আপনার শিশুর চোখ বা ফুসকুড়ি থেকে ক্রাস্টস অপসারণ করতে ফুটিয়ে ঠান্ডা করা পানিতে ভেজা কটন উল ব্যবহার করুন।

সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও মাই ডট ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক ডট ওআরজি

বিশ্বজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রত্যাবর্তন, কারণ কী

হাম কেন এত ছোঁয়াচে, কীভাবে ছড়ায়, চিকিৎসা কী

হামের প্রাদুর্ভাব: নিয়মিত টিকার বাইরে ১০ শতাংশ শিশু

১৯৭০-এর আগে জন্মগ্রহণকারীরা কেন প্রাকৃতিকভাবে হাম প্রতিরোধী

গত ৮ বছর হামের টিকা দেওয়া হয়নি: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

হামের টিকা সংগ্রহে জরুরি ভিত্তিতে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

রামেক হাসপাতালের ঘটনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ক্ষোভ

কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের’ মতো পরিচালিত হচ্ছে: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

বিশ্ববাসীর সামনে এক নীরব ঘাতক

অতিরিক্ত খিদে কমাতে খান প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার