বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গাপূজা আয়োজন করতে না দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হচ্ছে—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
আলোচিত দাবিতে কয়েকটি ভিডিও আছে এখানে ,এখানে, এখানে এবং এখানে।
ভিডিওটি শেয়ার করে ‘বাধন সরকার’ নামের একজন বলেন, ‘বাংলাদেশের হিন্দুদের পূজা না করার জন্য প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এবার আপনারা কিছু বলুন!’
‘Sanjit Mandal’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকেও আলোচিত দাবিতে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়। শেয়ার করা ভিডিওটিতে প্রায় হাজারের বেশি রিয়েকশন ও শতাধিক কমেন্ট রয়েছে। ছড়িয়ে পড়া পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অনেকেই প্রচারিত দাবিটিকে সত্য বলে মনে করেছেন।
ছড়িয়ে পড়া ২১ সেকেন্ডের ভিডিওতে ‘১৩ নম্বরের মাঠে, পূজা হতে দেব না’, ‘ঈদগাহের মাঠে, পূজা হতে দেব না’, ‘মানি না, মানব না’—এমন স্লোগান দিতে দেখা যায়। এ ছাড়া ভিডিওতে ‘এবার মিছিল করে বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজায় হিন্দুদের পূজা না করতে দেওয়ার হুমকি দিল জেহাদিরা’ এবং ‘ইসলামের স্বার্থে পূজা হতে দেব না’—এমন লেখা দেখা যায়। তবে ভিডিওটি কবে ও কোথায় ধারণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রচারিত ভিডিওটির দৃশ্যও অস্পষ্ট হওয়ায় এটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
জানা যায়, চলতি বছর ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরপর ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী, ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী পালিত হবে। তবে আলোচিত দাবির বিষয়ে অনুসন্ধানে জাতীয় কোনো গণমাধ্যম কিংবা নির্ভরযোগ্য সূত্রে দাবিটির পক্ষে কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ‘uttaranews24.com’ নামের একটি ফেসবুক পেজে শেয়ার করা একই ভিডিও পাওয়া যায়। ওই পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, ‘উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টর ঈদের জামাতের মাঠে ‘পূজা আয়োজন’ না করার দাবিতে এলাকাবাসীর মিছিল ও সমাবেশ...’।
এ ছাড়া ভিডিওটির ভেতরে ‘ঈদ জামাতের মাঠে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজার আয়োজন বন্ধে এলাকাবাসীর মিছিল’, ‘এলাকাবাসীর দাবি, উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরে সরকারের বরাদ্দ দেওয়া স্থানেই হোক পূজার আয়োজন’, ‘আজ (২৪ সেপ্টেম্বর) সকালে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে এলাকাবাসী এই বিক্ষোভ মিছিলটি করে’, ‘এলাকাবাসী জানায়, ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতেই সরকার নির্ধারিত স্থানে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা করুক’—ইত্যাদি লেখা পাওয়া যায়।
বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে ২০২৪ সালের ২৫ অক্টোবর ‘উত্তরায় মুগ্ধ চত্বরে হবে এবারের দুর্গা পূজা’ শিরোনামে ‘বার্তা বাজার’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীর উত্তরায় উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ দুর্গাপূজা আয়োজনের লক্ষ্যে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে পূজার স্থান নির্ধারণী বৈঠক ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে উত্তরার মুগ্ধ চত্বরকে সর্বসম্মতিক্রমে দুর্গাপূজা আয়োজনের চূড়ান্ত স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার বিকেলে দিয়াবাড়ি আর্মি ক্যাম্পে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, থানা কর্মকর্তা ও ছাত্র প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সভায় দিয়াবাড়ি আর্মি ক্যাম্পের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাহসিন বলেন, ‘আমরা চাই, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উৎসবমুখর পরিবেশে হোক। সেজন্যই এলাকাবাসীর সহযোগিতা সবার আগে প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সেক্টরের খেলার মাঠে পূজা আয়োজন নিয়ে এলাকাবাসীর মানববন্ধনের বিষয়টি উঠে আসায় নিরাপদ স্থানে পূজার স্থান নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পূজা কমিটির নেতারা উত্তরার দুটি স্থানের প্রস্তাব দেন এবং তাঁদের সুবিধামতো যেকোনো একটি স্থান বেছে নেওয়ার কথা জানানো হয়।
আরও কিছু (১, ২) গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকেও একই তথ্য পাওয়া যায়।
সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গাপূজা করতে না দেওয়ার হুমকির দাবিটি বিভ্রান্তিকর। বাস্তবে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের একটি মাঠে পূজা না করে নির্ধারিত অন্য স্থানে আয়োজনের দাবিতে এলাকাবাসীর করা একটি মিছিলের ভিডিওকে আলোচিত দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।