মতিঝিল থানা বিএনপির সভাপতি শিবলুর রহমান শিবুকে জনগণ গণপিটুনি দিয়েছে—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
আজ মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বেলা ২টার দিকে ‘Prime New Fanny Bd’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে আলোচিত দাবিতে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়। শেয়ার করা ভিডিওটির ক্যাপশনে দাবি করা হয়—‘গত বৃহস্পতিবার মতিঝিল থানা ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে এক নারী ৫ লাখ টাকা নিয়ে বের হওয়ার সময় শিবু তাঁর কাছে ১ লাখ টাকা দাবি করেন। ওই নারী টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁর হাতে থাকা ব্যাগ নিয়ে টানাটানি শুরু করেন শিবু। পরে ওই নারী চিৎকার করলে জনতার হামলার শিকার হন তিনি।’
আজ সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ভিডিওটি প্রায় ৪৫ হাজারের বেশি দেখা হয়েছে। এ ছাড়া এতে ১ হাজার ৫০০টি রিঅ্যাকশন, ২০০টি কমেন্ট ও এক হাজারবার শেয়ার রয়েছে। পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যবহারকারী দাবিটিকে সত্য মনে করে বিএনপির সমালোচনা করেছেন।
এ ছাড়া অনুসন্ধানে চলতি বছরের জুলাই মাসেও প্রায় একই দাবিতে বেশ কিছু ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে ভিডিওটি (১, ২, ৩শেয়ার করার তথ্য পাওয়া যায়।
প্রচারিত ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এক বৃদ্ধকে কয়েকজন মিলে মারধর করছেন। এ সময় অডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘ইনি মতিঝিল থানা বিএনপির সভাপতি... ইনি এক নারীর থেকে ৫ লাখ টাকা দাবি করছে।’ এ ছাড়া ভিডিও ব্যাকগ্রাউন্ডে ‘ভালো করে বাজাও গো দোতরা, বিএনপি নেতা নাচে’ গানটিও গাইতে শোনা যায়।
তবে ভিডিওটির অডিও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, সেখানে মূল ভিডিওর সঙ্গে আলাদা একটি ভয়েসওভার বা অডিও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। মূলত মারধরের ওই থমথমে ও বিশৃঙ্খল পরিবেশের মধ্যে বিএনপি নেতা বা ছিনতাই-সংক্রান্ত কোনো কথার উল্লেখ পাওয়া যায় না। বরং চারপাশের হট্টগোলের মধ্যে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘অনেক হয়েছে, এবার পুলিশে দে।’ জবাবে অন্য একজন বলেন, ‘পুলিশে তো ছেড়ে দেবে।’—যা ঘটনার মূল অডিও বলেই প্রতীয়মান হয়।
এ ছাড়া, প্রচারিত ভিডিওর ক্যাপশনে ঘটনাটি ‘গতকাল বৃহস্পতিবার’ ঘটেছে বলে দাবি করা হলেও পোস্টটি শেয়ার করার আগের দিন ছিল ‘সোমবার’—যা দাবিটির অসংগতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে জাতীয় কোনো গণমাধ্যম বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে মতিঝিলে কোনো নারীকে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে বের হওয়ার সময় চাঁদা দাবি ও এ ঘটনায় ওই ব্যক্তিকে গণপিটুনি দেওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মতিঝিল থানা বিএনপির কমিটিতে ‘শিবলুর রহমান শিবু’ নামের কোনো ব্যক্তি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, সে বিষয়েও অনুসন্ধান করা হয়। বিএনপির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে গত বছরের ৩০ আগস্ট প্রকাশিত মতিঝিল থানা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির দলীয় প্যাড পাওয়া যায়। ১৪ সদস্যের ওই কমিটিতে মতিঝিল থানা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে আলমগীর হোসেনের নাম রয়েছে। অর্থাৎ, বর্তমানে ‘শিবলুর রহমান শিবু’ নামের কোনো সভাপতি ওই কমিটিতে নেই। এ ছাড়া সাম্প্রতিক অনুসন্ধানেও মতিঝিল থানা বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক হিসেবে আলমগীর হোসেনের নাম পাওয়া গেছে।
পরে ‘Faysal Alam’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আলোচিত বিষয় নিয়ে প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। গত ২৫ জুলাই শেয়ার করা ভিডিওটির ক্যাপশনে বলা হয়, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি নিয়ে মতিঝিল থানার ওসি কামরুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তিনি বিষয়টি সত্য নয় এবং শিবলুর রহমান শিবু নামে মতিঝিল থানা বিএনপির কোনো সভাপতি নেই বলে জানিয়েছেন।’
ভিডিওতে মতিঝিল থানা বিএনপির আহ্বায়ক পরিচয়ে আলমগীর হোসেনকে বলতে শোনা যায়, তিনি শিবলুর রহমান শিবু নামের বা ভিডিওতে দেখা ব্যক্তিকে কখনো দেখেননি। তিনি আরও জানান, বর্তমানে তিনি মতিঝিল থানা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফয়সাল আলমের অ্যাকাউন্টে শেয়ার করা ভিডিওর নিচে আতিকুর লিটন নামের একজন কমেন্ট করেন, ‘যতটুকু মনে পড়ে, এটি ২০২০ সালের ঈদের দিনে কক্সবাজারের কোনো এক জায়গায় চাঁদার টাকা ভাগাভাগি বা আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মারামারির ঘটনা।’
এ বিষয়ে আরও অনুসন্ধানে ‘সত্যের সন্ধানে’ নামের একটি ফেসবুক পেজে চলতি বছরের ২৬ জুলাই আলোচিত ভিডিওর মারধরের শিকার ব্যক্তির ছবিসহ ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
ওই পোস্টের ক্যাপশনে দাবি করা হয়, গত কয়েক দিন ধরে ছবির এই বয়স্ক লোকটিকে মারধর ও লাঞ্ছিত করার ভিডিও অনেকের টাইমলাইনে ঘুরছে। আর লোকজন অন্ধ আক্রোশে তাঁকে গালিগালাজ করছে এবং লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় আনন্দ পাচ্ছে। কারণ, ভিডিওর ক্যাপশনে ভুল দাবি করা হচ্ছে যে, মতিঝিলে এক নারীর কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করতে গিয়ে তিনি ধরা খেয়ে পিটুনির শিকার হয়েছেন।
এবার আসুন আসল ঘটনা জানা যাক। ছবিতে থাকা বয়স্ক ব্যক্তিটির প্রকৃত নাম নুরুল আলম (৭২), বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়ায়। ঘটনাস্থল উপজেলার ঢেমুশিয়া ইউনিয়নের ছয়কুড়িটিক্কাপাড়া এবং ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২০ সালের ২৪ মে (ঈদের দিন)।
ঘটনার মূল হোতা ছিলেন স্থানীয় ঢেমুশিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি আনিছুর আলম। আনিছ ও তাঁর সহযোগীরা তুচ্ছ ঘটনার জেরে বৃদ্ধ নুরুল আলমকে টমটম থেকে নামিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে মারধর করেন এবং তাঁর পরনের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন।
এই সূত্র ধরে অনুসন্ধানে ‘কক্সবাজারে বৃদ্ধকে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল, আটক ৩’ শিরোনামে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। তবে ওই প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যের সঙ্গে ফয়সাল আলমের পোস্টের কমেন্ট ও ‘সত্যের সন্ধানে’ পেজের বিবরণের মিল থাকলেও প্রচারিত মূল ভিডিওটির ব্যক্তির সঙ্গে প্রতিবেদনে থাকা ব্যক্তির চেহারা ও স্থানের কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে ‘ব্যাংকের সামনে ৫ লাখ টাকা ছিনতাইচেষ্টা, হাতেনাতে আটক’ শিরোনামে জনবাণী নামের একটি ফেসবুক পেজে হুবহু একই ভিডিও পাওয়া যায়। ওই ভিডিওতে আক্রান্ত ব্যক্তি বা ঘটনার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘অনেক মারছেন, এবার তাকে পুলিশে দেন। টাকা তো পাইছেন, এবার পুলিশে দেন। ওদের বড় একটা চক্র আছে, সেটা বের করবেন; বড় একটা চক্র আছে।’
ভিডিওর ব্যক্তিটি কোনো ছিনতাইকারী বা অপকর্মকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত কি না—তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও তিনি যে মতিঝিল থানা বিএনপির সভাপতি নন, সে বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সিদ্ধান্ত
মতিঝিল থানা বিএনপির সভাপতি শিবলুর রহমান শিবুকে গণপিটুনি দেওয়ার দাবিটি ভিত্তিহীন। সুতরাং, আলোচিত দাবিতে ভিন্ন ঘটনার ভিডিও যুক্ত করে প্রচার করা হচ্ছে।