হোম > ফ্যাক্টচেক > দেশ

নারীর ভাস্কর্য ছুঁয়ে দাঁড়ানো ব্যক্তি চুয়েটের নতুন ভিসি শেখ শরীফুল নন

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক

চুয়েটের নতুন ভিসি শেখ শরীফুল আলমের দাবিতে ছড়ানো ছবি। ছবি: স্ক্রিনশট

সম্প্রতি একটি ছবি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে—ছবিটি চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের।

‘Jacob Milton’ নামের একটি ফেসবুক পেজে গত ২২ সেপ্টেম্বর আলোচিত দাবিতে একটি ছবি শেয়ার করা হয়। ‘তিনি নাকি বিএনপির নিয়োগকৃত চুয়েটের নতুন ভিসি মহোদয়!’—ক্যাপশনে শেয়ার করা ছবিটিতে ২৫ সেপ্টেম্বর বেলা ১২টা পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৬০০ রিয়েকশন, ১৮৬ কমেন্ট ও ২৭৮ শেয়ার রয়েছে।

এ ছাড়া ‘দিগন্ত টিভি’ নামের একটি পেজেও একই দাবিতে একটি ফটোকার্ড শেয়ার করা হয়। ‘বিএনপির নিয়োগ করা চুয়েটের নতুন ভিসির পুরাতন ছবি ভাইরাল’ শিরোনাম ও ক্যাপশনে শেয়ার করা ফটোকার্ডটিতে ৬ হাজার ৩০০ রিয়েকশন, ২০১ কমেন্ট ও ৪৮০ শেয়ার রয়েছে।

ছড়িয়ে পড়া এসব পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যবহারকারী দাবিটিকে সত্য মনে করেছেন। পোস্টের কমেন্টে একজন বলেন, ‘বাহ, ভিসি সাহেব, হা হা হা।’ অপর একজন বলেন, ‘বিএনপি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত মানেই সে বিএনপি করত। আর যে লোক বিএনপি করে, তার চরিত্র খারাপ হবে—এটাই স্বাভাবিক।’ আরেকজন বলেন, ‘Chi...chi..taholey pora shonar ki aboshta hobe bujtey parlam।’

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

প্রচারিত ছবিটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সাদা হুডি ও জিন্স পরা এক ব্যক্তি একটি নারীর ভাস্কর্যের স্তন স্পর্শ করে আছেন।

ছবিটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রথমেই সম্প্রতি উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়া নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত শেখ শরীফুল আলমের ছবি পর্যবেক্ষণ করে ফ্যাক্টচেক টিম। দেখা যায়, চুয়েট উপাচার্য এবং প্রচারিত ছবিতে থাকা ব্যক্তির শারীরিক গঠন ও চেহারার মধ্যে স্পষ্ট অমিল রয়েছে।

গণমাধ্যমে শেখ শরীফুল আলমের ছবি। ছবি: স্ক্রিনশট

দাবিটির বিষয়ে আরও অনুসন্ধানে ‘Sk. Shariful Alam’ নামের একটি ফেসবুক পেজ পাওয়া যায়। প্রোফাইলটি পর্যবেক্ষণে ২০০৯ সালে শেয়ার করা ‘The House of Juliet’ নামের একটি ফটো অ্যালবাম পাওয়া যায়। অ্যালবামটিতে শেখ শরীফুল আলমসহ আরও কয়েকজনের মোট ৬০টি ছবি রয়েছে। তবে ওই অ্যালবামে ভাস্কর্যটির স্তনে হাত দেওয়াসহ নানাভাবে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির ছবি থাকলেও শেখ শরীফুল আলমের ছবিটি আলাদা। একটি ছবিতে তাঁকে ভাস্কর্যটির কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

শেখ শরীফুল আলমের ফেসবুক অ্যালবামের ছবি। ছবি: স্ক্রিনশট

২০০৯ সালে শেখ শরীফুল আলমের ফেসবুক অ্যালবামে থাকা নিজের ছবি। ছবি: স্ক্রিনশট

অনুসন্ধানে জানা যায়, শেখ শরীফুল আলমের প্রোফাইলে পাওয়া ‘The House of Juliet’ অ্যালবামের ছবিগুলো ইতালির ভেরোনায় অবস্থিত জুলিয়েটের বাড়ি Casa di Giulietta-এর প্রাঙ্গণে তোলা।

এ বিষয়ে VenetoInside নামের একটি ইতালীয় ভ্রমণ ও পর্যটনবিষয়ক ওয়েবসাইটে ‘Juliet Statue in Verona’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটিতে জুলিয়েটের বাড়ির প্রাঙ্গণে থাকা ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।

ইতালীয় ভ্রমণ ও পর্যটনবিষয়ক ওয়েবসাইটে থাকা ছবি। ছবি: স্ক্রিনশট

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেরোনায় জুলিয়েটের বাড়ির উঠানে শেক্সপিয়ারের লেখা ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’ নাটকের নায়িকা জুলিয়েটের একটি ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য রয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ভাস্কর্যটির ডান স্তন স্পর্শ করলে সৌভাগ্য আসে। ১৯৬৯ সালে ভাস্কর্যটি তৈরি করেন ভাস্কর নেরেও কস্তান্তিনি এবং ১৯৭২ সালে ভেরোনার লায়ন্স ক্লাবের উদ্যোগে বাড়িটির উঠানে স্থাপন করা হয়।

দীর্ঘদিন পর্যটক ও দর্শনার্থীদের স্পর্শের কারণে ভাস্কর্যটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। বিশেষ করে সৌভাগ্যের আশায় জুলিয়েটের ডান স্তন স্পর্শ করার রীতির কারণে ভাস্কর্যটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ফলে মূল ভাস্কর্যটি পরে জুলিয়েটের বাড়ি-মিউজিয়ামের ভেতরের একটি কক্ষে সরিয়ে নেওয়া হয়। ২০১৪ সালে জুলিয়েটের ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যটির একটি প্রতিলিপি বাড়িটির উঠানে স্থাপন করা হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভেরোনা ভ্রমণে ‘জুলিয়েটের বাড়ি’ দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি।

কম্পেরিজন: আজকের পত্রিকা

সিদ্ধান্ত

ভাস্কর্যের স্তনে হাত দেওয়া ছবিটি চুয়েটের নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের নয়। ২০০৯ সালে ইতালির ভেরোনা ভ্রমণে একাধিক ব্যক্তির ভাস্কর্যের স্তনে হাত দেওয়া ছবি শেখ শরীফুল আলম নামের একটি ফেসবুক পেজের অ্যালবামে রয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো ছবিটি ওই অ্যালবামে নেই। আর প্রচারিত ছবির ব্যক্তির চেহারার সঙ্গে শেখ শরীফুলের মিল নেই।

উল্লেখ্য, চুয়েটে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। প্রতিবাদে ওই রাতেই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। আন্দোলনের কারণে অচল হয়ে পড়েছে ক্যাম্পাস। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা factcheck@ajkerpatrika.com