‘নাটোরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মহসিনের ঘরবাড়িতে জামায়াত-শিবিরের পাকিস্তানি বাহিনী আগুন দিয়েছে’—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
আলোচিত দাবিতে ফেসবুকে (১, ২, ৩ ) ও ইনস্টাগ্রামে (১, ২ ) বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়েছে।
‘বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ’ নামের একটি অ্যাকাউন্টে গতকাল বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) শেয়ার করা ভিডিওতে ১ হাজার ৭০০টি রিঅ্যাকশন, ৮৭টি কমেন্ট ও ৫৪৩ বার শেয়ার রয়েছে।
ছড়িয়ে পড়া পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যবহারকারী দাবিটিকে সত্য মনে করেছেন। আবার কেউ কেউ ভিন্নমত পোষণ করেছেন। পোস্টের কমেন্টে একজন লেখেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা, ঘৃণা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি!’
আরও একজন লেখেন, ‘এমন কাজ কোনো হৃদয়বান বা ইসলামপ্রিয় মানুষ করতে পারে না।’ অন্য একজন বলেন, ‘আমি সরকারকে বলব, অবিলম্বে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাবিরোধীদের আইনের আওতায় আনা হোক। এটা একমাত্র স্বাধীনতাবিরোধীদের কাজ। যারা এই বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি, তারাই আজ মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দিচ্ছে।’ একজন আবার লেখেন, ‘ভাই, এটা তো আমাদের গ্রামের ভিডিও, মানিকগঞ্জের সিংগাইর থানার।’
প্রচারিত ১৪ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে একটি বাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। এ ছাড়া ভিডিওতে লুঙ্গি পরা এক ব্যক্তিকে কিছু বলতে দেখা গেলেও শব্দের কারণে তাঁর কথা বোঝা যায়নি।
দাবির সত্যতা যাচাইয়ে নাটোরে সম্প্রতি এমন কোনো অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে কি না—তা জানতে অনুসন্ধান চালানো হয়। তবে এমন কোনো ঘটনা সম্পর্কিত প্রতিবেদন জাতীয় কোনো গণমাধ্যমে পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে ‘Md. Mohidur Rahman’ নামের একটি অ্যাকাউন্টে হুবহু একটি ভিডিও পাওয়া যায়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর বেলা ২টা ৪২ মিনিটে শেয়ার করা ভিডিওর ক্যাপশনে বলা হয়, ‘জাইল্লা এখলাছ ও আমিনুরের বাড়ি আগুনে পুড়ে শেষ।’
একই দিন বিকেল ৫টা ৩ মিনিটে শেয়ার করা আরও একটি ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা, ‘আগুন নেভানোর পরের অবস্থা। ছাই ছাড়া আর কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই। মহান আল্লাহ তায়ালা সকলকে এমন বিপদ থেকে রক্ষা করুন।’
এ ছাড়া মহিদুর রহমান নামের অ্যাকাউন্টিতে গতকাল (১ অক্টোবর) শেয়ার করা আরও একটি পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টের ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জামির্তা ইউনিয়নের জাইল্লা আমিনুরের বাড়িতে আগুন লাগার ভিডিও নিয়ে নেতিবাচক কমেন্ট আসায় পোস্টটি আবার শেয়ার করতে হয়েছে।’
পোস্টে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘আগুন লাগার সময় সেখানে একজন বয়স্ক নারী ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বিদ্যুৎ না থাকা, পানির সংকট এবং গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণের কারণে বাধার মুখে পড়তে হয়। পরে পুকুর থেকে পানি এনে পাশের দুটি ঘর আগুন থেকে রক্ষা করা হয়।’ ফায়ার সার্ভিসকে ফোন করার প্রায় ৩০ মিনিট পর তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বলেও পোস্টে দাবি করা হয়।
ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে ফ্যাক্টচেক টিম আজকের পত্রিকার সিংগাইর উপজেলা প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করে। তিনি জানান, গত ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জামির্তা ইউনিয়নের স্বল্প জাইল্যা গ্রামে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এই ভয়াবহ আগুনে আমিনুল (৪৮) ও ইখলাস (৫৬) নামের দুই ভাইয়ের দুটি বসতঘর পুড়ে গেছে এবং এতে আনুমানিক ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিনিধি আরও জানান, খবর পাওয়ার পরপরই সিংগাইর থানা-পুলিশের একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তেও নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, অগ্নিকাণ্ডের উৎস ছিল গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ। দুর্ঘটনায় ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পাশাপাশি, ক্ষতিগ্রস্ত ওই পরিবারের কেউ মুক্তিযোদ্ধা নন বলেও নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় প্রতিনিধি।
নাটোরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মহসিনের ঘরবাড়িতে জামায়াত-শিবিরের লোকজন আগুন দিয়েছে—এমন দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি বিভ্রান্তিকর। মূলত, ভিডিওটির ঘটনাস্থল নাটোর নয়; এটি মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্য।