‘কলকাতা বিমানবন্দরের কাছে ১৩৬ বছরের পুরোনো গৌরী জামে মসজিদ বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে’—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
কেউ কেউ ভিডিওটি শেয়ার (১, ২) করে দাবি করেছেন, মন্দির নির্মাণের জন্য মসজিদটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।
‘MEHF VOICE’ নামের একটি ফেসবুক পেজে আলোচিত দাবিতে ২২ সেপ্টেম্বর একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়। হিন্দি ভাষার ক্যাপশনে শেয়ার করা ওই ভিডিওটি প্রায় ৭০ হাজার বার দেখা হয়েছে এবং এতে হাজারের বেশি রিঅ্যাকশন রয়েছে। পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যবহারকারী দাবিটিকে সত্য মনে করেছেন।
পোস্টের কমেন্টে একজন লেখেন, ‘খুব ভালো কাজ, আবর্জনা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।’ অন্য একজন বলেন, ‘সবই হিসাব করা হবে। এটা কিছুক্ষণের জন্য শুধু নীরবতা, তারপর শব্দ হবে। আজ এই কুকুরদের যুগ, ঈশ্বরের ইচ্ছায়, আগামীকাল আমাদের যুগ আসবে।’ আরেকজন বলেন, ‘মুসলিমরা ভারতে অবৈধভাবে বসবাস করছে, তাই মসজিদগুলোও অবশ্যই অবৈধ—সবগুলোই ভেঙে ফেলা উচিত।’
প্রচারিত ২২ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, দুই ব্যক্তি হাতুড়ি দিয়ে একটি নীল রঙের দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করছেন। এ সময় বাইরে থেকে কয়েকজনকে মোবাইল ফোনে ভিডিও করতে দেখা যায়।
এ ছাড়া ভিডিওটির ভেতরে লেখা রয়েছে, ‘কলকাতা বিমানবন্দরের কাছে ১৩৬ বছরের পুরোনো গৌরী জামে মসজিদটি হিন্দু সন্ত্রাসীরা বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দিয়েছে! রাম মন্দির নির্মাণের নামে মসজিদটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সবকিছু মনে রাখা হবে।’
কলকাতা বিমানবন্দর এলাকার গৌরীপুর জামে মসজিদ (বাঁকড়া মসজিদ) ভেঙে ফেলা হয়েছে কি না—তা জানতে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে অনুসন্ধান চালানো হয়।
‘টাইমস অব ইন্ডিয়ার’ গত ২২ মে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার পরিবর্তনের পর কলকাতা বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত ১৩৬ বছরের পুরোনো গৌরীপুর জামে মসজিদ, যা বাঁকড়া মসজিদ নামেও পরিচিত, সেটি সরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা নতুন করে শুরু হয়েছে।
প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের বরাতে জানানো হয়, বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ের ১৬৫ মিটার (৫৪১ ফুট) উত্তরে মসজিদটির অবস্থান। এটি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি উড়োজাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে। তবে আগের সরকারগুলো মসজিদটি সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিষয়টি তিন দশকের বেশি সময় ধরে বিতর্কের কারণ হয়ে আছে। তবে মসজিদটি ভেঙে ফেলার কোনো তথ্য ওই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
পাশাপাশি বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কলকাতা বিমানবন্দরের কাছে ১৩৬ বছরের পুরোনো গৌরীপুর জামে মসজিদ বা বাঁকড়া মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়নি। তবে সেখানে সাধারণের প্রবেশ ও নামাজ পড়া অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৭ জুলাই সংবাদ সংস্থা ‘এএনআই’ (ANI) প্রকাশিত ওই মসজিদের ভিডিওর সঙ্গে প্রচারিত ভিডিওর স্থাপনার কোনো মিল নেই।
ভিডিওটির বিষয়ে আরও অনুসন্ধানে বেশ কয়েকটি ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে হুবহু একই ভিডিওর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে সেসব পোস্টের ক্যাপশনে দাবি করা হচ্ছে—এটি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বাড়ি ভাঙচুরের দৃশ্য এবং এই ভাঙচুর চালিয়েছে বিএনপি।
অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ২০ সেপ্টেম্বর ‘শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যা, আসামির বাড়ি গুঁড়িয়ে দিল জনতা’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর দৃশ্যগত মিল পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পাবনা সদরে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলার প্রধান আসামি মোস্তফা প্রামাণিকের বাড়িতে স্থানীয় জনতা ভাঙচুর চালায়। ১৯ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) জুমার নামাজের পর লোকজন ওই বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে তাঁরা দরজা-জানালা, আসবাবসহ বাড়ির বিভিন্ন অংশ ভাঙচুর করেন এবং বড় হাতুড়ি দিয়ে বাড়ির ছাদও ভাঙেন। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন থাকলেও জনতার তুলনায় পুলিশ কম থাকায় শুরুতে ভাঙচুর ঠেকানো সম্ভব হয়নি। পরে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শিশুটি ৯ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হওয়ার পর ১৬ সেপ্টেম্বর বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় প্রধান আসামি মোস্তফা প্রামাণিক ও তাঁর বাড়ির ভাড়াটে ইয়াছিন আলীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া বেশ কয়েকটি (১, ২, ৩) গণমাধ্যমের ভিডিও প্রতিবেদনের সঙ্গেও আলোচিত ভিডিওটির হুবহু মিল পাওয়া যায়।
কলকাতা বিমানবন্দরের কাছে ১৩৬ বছরের পুরোনো গৌরীপুর জামে মসজিদ ভাঙচুর কিংবা বিএনপির নেতা-কর্মীরা এনসিপির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর বাড়ি ভাঙচুর করেছেন দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি ভিন্ন ঘটনার। প্রকৃতপক্ষে, পাবনা সদরে এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার এক আসামির বাড়িতে ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতার ভাঙচুরের ভিডিওকে ভিন্ন ভিন্ন দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।