হোম > ছাপা সংস্করণ

অর্থনীতিতে অরাজকতা

এম এম আকাশ

বিপুল আত্মত্যাগ, রক্তস্রোত ও অবর্ণনীয় ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর বুকে জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের। এ দেশ ছাড়ার আগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের প্রায় সবকিছুই ধ্বংস করে দিয়েছিল, পোড়ামাটি নীতি অবলম্বন করেছিল। যার ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো, উৎপাদন ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরিভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক অবকাঠামো বিনির্মাণ ও উৎপাদন ব্যবস্থা সচল করাই ছিল প্রধান দায়িত্ব। বঙ্গবন্ধু সরকার সেই দায়িত্ব পালনে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল।

প্রথম অর্থবছরে তাজউদ্দীন আহমদ যখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিলেন, তখন দ্রুতবেগে আন্তরিকতার সঙ্গেই অর্থনৈতিক অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছিল। পরিত্যক্ত কলকারখানা সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল। ধ্বংসপ্রাপ্ত রাস্তাঘাট, সেতু, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছিল। দেশ স্বাধীন করার অনুপ্রেরণায় শ্রমিক, ছাত্র-জনতা একযোগে দেশ গঠনে কাজ করছিল। সব মিলিয়ে বলা যায়, বিশাল আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা যেন বৃথা হয়ে না যায়, তার জন্য আন্তরিকতার সঙ্গেই কাজ করছিল। সবার মধ্যেই একটা দৃঢ় চেতনা ছিল যে পাকিস্তানিদের তাড়িয়ে দেশ যেমন মুক্ত করতে পেরেছি, সুন্দরভাবে দেশ গঠনও করতে পারব।

পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হচ্ছিল, বৈদেশিক সাহায্য ও বাজেটের অর্থ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল; বাইশটি পরিবারের হাতে কুক্ষিত ছিল অনেক কিছু। সুতরাং স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম লক্ষ্যই ছিল অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে সব রকম বৈষম্য দূর করব, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করব। সম্পদ যেহেতু বাইরে পাচার হবে না, সম্পদ দেশের মধ্যেই ঘূর্ণমান হবে, সেহেতু দেশের সম্পদ আরও বাড়বে। যার ফলে সমৃদ্ধি হবে, সুষম বণ্টনও হবে।

এ জন্য সংবিধানে আমরা সমাজতন্ত্র কথাটি যোগ করেছিলাম, অনুপার্জিত হয় নিষিদ্ধ করার কথাও যোগ করেছিলাম। যোগ করেছিলাম সবার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাবিধানের কথাও। সব মিলিয়ে আমাদের একটা চমৎকার ভিশন ছিল, প্রতিজ্ঞা ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর দেশের রাজনীতি, অর্থনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে অরাজকতা শুরু হয়েছিল। দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নিতে শক্তিশালী গণতন্ত্র কিংবা সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা দরকার ছিল, রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা ছিল না। যার ফলে ব্যাহত হয়েছিল অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা।

সংবিধানের চারটি মূলনীতি অনুসারে আমাদের অর্থনীতি হওয়ার কথা ছিল সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা যাঁরা প্রণয়ন করছিলেন, তাঁদের শেখ মুজিব নির্দেশ দিয়েছিলেন সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে যেন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সেই লক্ষ্যেই কলকারখানাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয় খাতে আনা হয়। আমরা যদি প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সঙ্গে তুলনা করে মূল্যায়ন করি, তাহলে দেখব বাংলাদেশ আজ সেখান থেকে যোজন যোজন দূরে নয়, একেবারে উল্টো পথে হাঁটছে।

১৯৭৫ সালের পর পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়। মূলত লুণ্ঠনমূলক পুঁজিবাদ। এখনও সেই লুণ্ঠনমূলক পুঁজিবাদের ধারা অব্যাহত আছে। কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থায় অরাজকতা ও বৈষম্য বেশ প্রকট। দারিদ্র্য ও অতিদারিদ্র্য রেখার ওপরে অনেকেই উঠেছে বটে, তবে সেটা শম্বুক (শামুক) গতিতে।

অপর দিকে ধনীরা আরও ধনী হয়েছেন। উচ্চবিত্তের সম্পদ যেন বাড়ছে অশ্বের গতিতে। বৈষম্যটা ঠিক এখানেই। মধ্যবিত্ত শ্রেণির আপেক্ষিক গুরুত্ব বাড়ছে ঠিক, কিন্তু এরপরই বিশাল ফারাক, যেখানে অনেক উঁচুতে অল্পকিছু লোকের হাতে অধিক সম্পদ। এই উচ্চবিত্তদের জাতীয় শিকড় বাংলাদেশে নেই। বিদেশে বাড়ি তাঁদের। তাঁদের সন্তানরা বাইরে পড়েন। বাইরে ব্যবসা করেন। তাঁরা দেশে আয় করে বিদেশে পাচার করছেন। ট্যাক্স দিচ্ছেন না। এটিই আমাদের অর্থনীতির উল্টোপথ, যেখানে বৈষম্যটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এই উচ্চবিত্তরা মূলত নিয়মের ধার ধারেন না। ঘুষ, দুর্নীতি, ম্যানেজ করে প্রশাসনকে বশে আনছেন।

এতে গোটা অর্থব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা কলুষিত হচ্ছে।

বিজয়ের একান্ন বছরে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে বটে। তবে সামগ্রিক চিত্র হতাশাজনক। সম্পদের সুষম বণ্টন যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি সম্পদ পাচার রোধ করা।

নচেৎ সবকিছুই ভেস্তে যেতে পারে। ব্যাহত হতে পারে উন্নয়নের ধারা।

লেখক: এম এম আকাশ, অধ্যাপক, অর্থনীতিবিদ

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন

রোজা রেখে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে কি?

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস