আমাদের বিশেষ বাহিনীর রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল—এই যুদ্ধ দীর্ঘকাল চলবে এবং মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন দলের দ্বন্দ্বও হিসাবে রাখতে হবে। এ জন্য সম্ভবত আমাদের ৪০ জনের পিঠে বুলেট, বিস্ফোরক, অস্ত্রসহ মণখানেক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
মহাকালে ভেসে ভেসে চলছি। মহাকালের একটা সুবিধামতো হিসাবে দিন-কাল-ঘণ্টা-তারিখ বিজ্ঞানীরা ঠিক করে দিয়েছেন। অতএব, প্রতিবছর আসবেই একবার ১১ নভেম্বর। আমরা বাংলাদেশের কিছু মানুষ শারীরিক বা মানসিকভাবে ‘বেতিয়ারা’ চলে যাবই।
‘বেতিয়ারা’ পৃথিবীর ভূখণ্ডে একটি ভৌগোলিক গ্রামের নাম। জেলা: কুমিল্লা, উপজেলা: চৌদ্দগ্রাম। একাত্তরের ১১ নভেম্বর রাত সাড়ে ১০টায় আমরা ঢাকার ৩টি গেরিলা গ্রুপ বাংলাদেশের মানচিত্র শত্রুমুক্ত করার লক্ষ্যে উত্তর-পূর্ব ভারতে সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে ৬৮ জন বাংলাদেশে প্রবেশ করি ভৈরবটিলা থেকে। ওটা ত্রিপুরা অঞ্চল। বাংলাদেশের যে গ্রামটিতে প্রবেশ করি, সেই রক্তজমিনের নাম যে ‘বেতিয়ারা’, তা জানলাম পরদিন। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে বহন করে চলেছি বেতিয়ারা শব্দটির হীরকদ্যুতি, বেতিয়ারার শিশির জল, বেতিয়ারার সহযোদ্ধা হারানোর হাহাকার।
কেউ কেউ জানেন। কেউ জানেন না। আমরা একাত্তরের ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের সম্মিলিত গেরিলা যোদ্ধারা বিশেষ গেরিলা বাহিনী ভারতের তেজপুরসহ বিভিন্ন স্থানে স্বল্প সময়ের হঠাৎ-আক্রমণের গেরিলা প্রকৌশলের সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলাম।
আমাদের মূল প্রশিক্ষণকেন্দ্র ছিল ভারতের আসাম রাজ্যের তেজপুরের বিশাল সামরিক ঘাঁটিতে। তিনটি প্রশিক্ষণ ব্যাচ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছিল। চতুর্থ ব্যাচটি নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্বে গুছিয়ে করতে পারেনি। এ হিসাবে তেজপুরে দেড় হাজার গেরিলা প্রশিক্ষণ নিতে সক্ষম হয়েছিল। তবে দেশের ভেতরে, ভারতের তেজপুরসহ বিহার, আগরতলা, কোচবিহার প্রভৃতি স্থানে আমাদের বাহিনীর সম্ভবত হাজার পাঁচেক সদস্য সশস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে সফল হয়েছিল। তবে ভারত এবং দেশের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সহযোগী বাহিনী, প্রচারকবৃন্দ গোপন কার্যক্রমের কঠিন দায়িত্বভারপুষ্ট মিলিয়ে একটি হিসাবে প্রায় ১৭ হাজার সঙ্গী আমাদের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর কাজে সমন্বিত হয়েছিল। উল্লেখ্য, মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ এবং ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের বাহিনীই সংশ্লিষ্ট ছিল।
তেজপুরে আমাদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণে প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ কমান্ডার ছিলেন ওসমান গণি। তাঁর সহকারী ছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। দ্বিতীয় ব্যাচের প্রধান প্রশিক্ষণ কমান্ডার ছিলেন প্রকৌশলী মর্তুজা খান এবং সহকারী ছিলেন মাহবুব জামান। চতুর্থ ব্যাচের যথাযথ ডকুমেন্ট দেখিনি। বাংলাদেশের চারপাশ ধরে বিভিন্ন দিক দিয়ে আমরা স্বদেশে প্রবেশ করেছিলাম, যা তখন ‘ইন্ডাকশন’ বলা হতো।
ভারত সরকার গোপনে আমাদের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল বিশেষ কারণেই। ফলে আমাদের সামরিক কমান্ডের কাঠামো ও কমান্ড সম্পর্কে আমরা অবহিত ছিলাম না। সংশ্লিষ্ট ভারতীয় সামরিক অফিসাররা আমাদের ‘আলফা ফোর্স’ নামে অভিহিত করেন।
আগরতলায় আমাদের প্রাথমিক ক্যাম্প ছিল ‘ক্র্যাফট হোস্টেল’। সেটি পরিচালনা করতেন জ্ঞান চক্রবর্তী, পঙ্কজ ভট্টাচার্য ও মতিয়া চৌধুরী। রিক্রুটিংয়ের কাজে নিয়োজিত ছিলেন সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ‘ইন্ডাকশন’ কার্যক্রমে নিয়োজিত ছিলেন। দেশের ভেতরে সবাই প্রবেশ করলে যে সামরিক কমান্ডের কাঠামোগত সুশৃঙ্খলরূপে আমরা পরিচালিত হতাম, তার পরিচয় জানা যেত। তবে দেশের অনেক স্থানেই আমাদের বিশেষ গেরিলা বাহিনী খণ্ডযুদ্ধ পরিচালনা করেছে। দেশব্যাপী বেশ কয়েকটি বাহিনী সক্রিয় থাকায় এবং ঘোর বর্ষাকাল হওয়ায় পাকিস্তানের দুর্ধর্ষ বাহিনীও একপ্রকার ক্যাম্পবন্দীই ছিল, বিশেষত গণহত্যা অপারেশন ছাড়া। রাজাকার, আলশামস ও আলবদররা ছিল তাদের নির্মম অত্যাচার, খুন, ধর্ষণ প্রভৃতি কাজের সহযোগী।
আমাদের বিশেষ বাহিনীর যে তিনটি গ্রুপ দেশে প্রবেশ করেছিল ১১ নভেম্বর, তার মুভমেন্ট অধিনায়ক ছিলেন স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। ৫০ বছর পর স্মৃতিসংকটে কেউ কেউ হয়তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ বা বড় দায়িত্বের নেতাদের ‘বেতিয়ারা যুদ্ধের অধিনায়ক’ হিসেবে চিহ্নিত করে ইতিহাসবিভ্রম সৃষ্টি করেন। একাত্তরের সেই ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন বিগত ৫০ বছরে নানারূপ বিভক্তিতে নানা নাম বহন করছে। তখন যাঁরা এক কাতারে ছিলেন, তাঁরা যদি সম্মিলিতভাবে একটি সম্মত ইতিহাস তৈরি করতে সক্ষম হন, তবে অনেক অহেতুক বিতর্ক থেকে আমরা রেহাই পাই।
১১ নভেম্বর ১৯৭১। রাত সাড়ে ১০টার দিকে আমরা ভৈরবটিলা থেকে নেমে আসি। কিছুক্ষণ পরেই ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক দিয়ে আমরা গুণবতী হয়ে নোয়াখালী জেলায় প্রবেশ করব। শত্রুর হঠাৎ আগমনকে রুখে দিতে আমরা প্রতিরোধ-প্রস্তুতি নিয়েছিলাম; কিন্তু আচমকা আমরা শত্রুর অ্যামবুশ ফাঁদে পড়ে গেলাম। এতে আমাদের কোথায় কার কী ভুল, এসবের কোনো তদন্ত হয়েছিল কি না, হলেও ডকুমেন্ট কী—এসব প্রশ্ন তুলে বিতর্কের ফেনা তুলে কোনো লাভ দেখি না। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার। আমাদের মুভমেন্ট দল ছিল কয়েক ভাগে বিভক্ত। সামনের স্কাউট ও অ্যাটাক বাহিনী, কাভার পার্টি, ক্যারিং পার্টি ও পশ্চাতের প্রহরী দল। আমাদের বিশেষ বাহিনীর রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল—এই যুদ্ধ দীর্ঘকাল চলবে এবং মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন দলের দ্বন্দ্বও হিসাবে রাখতে হবে। এ জন্য সম্ভবত আমাদের ৪০ জনের পিঠে বুলেট, বিস্ফোরক, অস্ত্রসহ মণখানেক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই বোঝা পিঠে চেপে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে পথে পথে যুদ্ধ করা ছিল অত্যন্ত দুরূহ। শত্রুর অ্যামবুশ যদি শতভাগ সফল হতো, আমরা কেউ সেদিন বাঁচতে পারতাম না। সে জন্যই প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে আমাদের শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল—যখনই অ্যামবুশে পড়বে, তখনই দৌড়ে পালাবে। জীবন বাঁচানোই তখন বিজয় কিংবা সাফল্য। ৬৮ জনের মধ্যে মাত্র ৯ জনকে আমরা হারাই। এটা আমাদের বাহিনীর সাফল্যই বটে!
এই সাফল্যের গভীরে আছে মহাবিষাদ। যেখানে থাকি তার উল্টো দিকে শহীদ নিজামুদ্দিন আজাদ থাকত। এমন চটপটে, চৌকস, সাহসী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বৈশিষ্ট্যের তরুণ খুব কমই মেলে। বিশাল ময়দানে ৮ কিলোমিটার ঘূর্ণিদৌড়ে শ্বাসকষ্টের রুগ্ণতায় মাটিতে পড়ে গেছে আজাদ, তবু সে উঠে গেছে। মনোবল কাকে বলে, আমাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ গেরিলা চে গুয়েভারা ধাঁচের আজাদ তা আমাদের দেখিয়েছে। রাষ্ট্রদূত ও লেখক কামরুদ্দিন আহমেদের সন্তান আজাদ। তাঁদের বাসভবন আজাদের নেতৃত্বের অভাবে নানা ট্র্যাজেডিতে আকীর্ণ।
ছাত্র ইউনিয়ন থেকে সদ্য কৃষক আন্দোলনে সংযুক্ত সিরাজুম মুনীর রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে পত্রপত্রিকা কাঁধে নিয়ে আমাদের সঙ্গে ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চাঁদপুরের কাইয়ুমও। রায়পুরার বশীর মাস্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র গোদনাইলের আওলাদ হোসেন, দশম শ্রেণির ছাত্র সউদ, রায়পুরার জোয়ান কৃষক জহিরুল হক দুদু মিয়া, স্থানীয় সহায়ক আব্দুল কাদের, শফিউল্লাহ—৯ জনের শাহাদতে পবিত্র হলো বেতিয়ারার জমিন।
সিরাজুম মুনীর ছিলেন সম্ভাবনাময় গল্পকার সোমেন চন্দ। তাঁর পাণ্ডুলিপিও হারিয়ে গেছে। বশীর মাস্টারের বেঁচে থাকা ছাত্ররা আজও স্যারের ব্যক্তিত্বে মোহাবিষ্ট। ফুরফুরে হাসিমুখের গান গাওয়া আওলাদের কণ্ঠস্বর কোন ইথারে, কোথায়। সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলের টলটলে চোখের কিশোর সউদের রক্ত মিশে গেছে বেতিয়ারার জমিনে।
এবার বলি শহীদ জহিরুল হক দুদু মিয়ার কথা। প্রশিক্ষণের জন্য শেষবার ঘর ছাড়ার আগে মায়ের হাতের পিঠা খেয়েছিলেন জানি। দুঃসাহসী দুদু মিয়া বেতিয়ারায় ধরা পড়ে গেলেন শত্রুর হাতে। ওরা বারবার বলল, ‘বোলো পাকিস্তান জিন্দাবাদ’। জহিরুল হক দুদু মিয়া নিক্ষিপ্ত বুলেট শরীরে বহন করে বারবারই বলতে থাকেন: ‘জয়-য়-য় বাংলা’। তারপর সাহসের রূপকথার পাখি নিস্তব্ধ। এমন দুদু মিয়াকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ বলব আমরা নিঃসন্দেহে।
স্বাধীনতার পর খেতাব দেওয়ার কাজটি সুশৃঙ্খল ও সম্পূর্ণ ছিল না। বিনীত এবং একান্ত নিবেদন: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সম্মানীয় নব সেনাপ্রধান, আপনারা দেখুন, বুঝুন, নব-উদ্যমে বিচার করুন—সাহস বিচারে এমন খেতাবের ন্যায়সংগত প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এই পদ্মা-মেঘনা-যমুনার কতজন ভাই আর বোন? যে যাই বলুন, বেতিয়ারার সেই ১১ নভেম্বর রাতের একজন বীরশ্রেষ্ঠর ‘জয় বাংলা’র বিজয়ী রণধ্বনি শোনার কয়জন আমরা এখনো আছি তো বেঁচে। হে মহাকাল, তোমার গগনে এই বীরশ্রেষ্ঠ জহিরুল হক দুদু মিয়া ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলজ্বল করুক।
হিলাল ফয়েজী , বীর মুক্তিযোদ্ধা, রম্যলেখক