হোম > ছাপা সংস্করণ

নভেরার নকশায়

আফরিন শাহনাজ

নভেরা আহমেদকে আমরা কোন পরিচয়ে চিনি? আমরা জানি নভেরা আহমেদ একজন বাংলাদেশি ভাস্কর, যিনি প্রায় ৪৫ বছর প্যারিসে বসবাস করেছেন এবং সেখানেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আমরা তাঁকে চিনি বিংশ শতাব্দীর প্রথম বাংলাদেশি আধুনিক ভাস্কর হিসেবে। কিন্তু নভেরার কাজ সম্পর্কে আমরা খুব বেশি পরিচিত নই। আমরা অনেকেই জানি না কিংবা বলা ভালো মনে রাখি না যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মূল পরিকল্পনা ও নকশা ভাস্কর নভেরা আহমেদ ও শিল্পী হামিদুর রহমানের করা। শহীদ মিনারের স্থপতি হিসেবে শুধু বারবার শিল্পী হামিদুর রহমানের নামই উল্লেখিত হয়েছে। ভাস্কর নভেরা আহমেদ এক অনুচ্চারিত নাম হিসেবেই রয়ে গেছেন।

সৈয়দ শামসুল হক ১৯৯১ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘হৃৎকলমের টানে’ বইতে লিখেছেন: ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশা করেছিলেন যে দু’জন তাঁদের একজনের কথা আমরা একেবারেই ভুলে গিয়েছি। প্রথমত, আমরা অনেকেই জানি না এই মিনারের নকশা কারা করেছিলেন, যদিওবা জানি তো জানি শুধু শিল্পী হামিদুর রহমানের নাম; খুব কম লোকে চট করে মনে করতে পারে যে হামিদুরের সঙ্গে আরও একজন ছিলেন। হামিদুরের সঙ্গে ছিলেন বলাটা ভুল, বলা উচিত দুজনে একসঙ্গে এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের রূপটি রচনা করেছিলেন; অপর সেই ব্যক্তিটি হচ্ছেন নভেরা আহমেদ।’

 ২০১০ সালে কথাসাহিত্যিক আনা ইসলামের কাছে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শিল্পী আমিনুল ইসলাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের শুরুর কথা বলেন,  ‘১৯৫৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান শহীদ মিনারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অনুরোধ করেন প্রধান প্রকৌশলী জব্বার সাহেব এবং জয়নুল আবেদিনকে। তখন লেকলেন বলে এক ইংরেজ ছিলেন চিফ আর্কিটেক্ট, পূর্ব পাকিস্তান সরকারের। আর মাজহারুল ইসলাম সাহেব। লেকলেন বললেন, ভাষা আন্দোলনের সিম্বল; বাঙালি আর্কিটেক্টের করা উচিত।...মাজহার সাহেবকে পাঠানো হলো। স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি ডিজাইন করতে রাজি ছিলেন না। হামিদ শুনল, শহীদ মিনারের ডিজাইন হবে। হামিদ করিৎকর্মা ছিল তো কথাবার্তায়, বলল যে আর্কিটেক্টরা না করলে আর্টিস্টরা করতে পারে। শহীদ মিনারের ডিজাইনের জন্য পত্রিকায় কোনো বিজ্ঞাপন দেয়া হয়নি। তখন হামিদ আর নভেরা মিলে একটা ডিজাইন দাঁড় করাল। ওটা আমি দেখেছি।...মেইন নকশা নভেরার করা। হামিদ পেইন্টিং ভালো করত। স্কাল্পচার সম্পর্কে কোনো আইডিয়া ছিল না।...’৫৭ সালের প্রথম থেকেই হামিদ ও নভেরা মিলে শহীদ মিনারের পরিকল্পনা নিয়ে খুবই ব্যস্ততায় ছিল ’৫৮ সাল পর্যন্ত। রাত-দিন খেটে অর্ধনির্মিত শহীদ মিনারের বেজমেন্টে একটি ম্যুরাল সম্পন্ন করেন হামিদ ১৯৫৮ সালে।

এই ম্যুরালটি হামিদের শ্রেষ্ঠ কাজ, যা ১৯৭১-এ ধ্বংস করা হয়।’

পরিকল্পনাটি এসেছিল নভেরার ‘সিটেড উইমেন’ নামের দুটি ভাস্কর্য থেকে। তাঁর এই ভাস্কর্যগুলোতে মাতৃ প্রতিকৃতি ও আনত সন্তানের সম্পর্ক ছিল। এটাই শহীদ মিনারের মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে। ২০২০ সালে প্রকাশিত হয় আনা ইসলামের ‘নভেরা: বিভুঁইয়ে স্বভূমে’ বইটি। আনা ইসলামের ‘নভেরা: বিভুঁইয়ে স্বভূমে’ বইতে নভেরার সাক্ষাৎকারসহ প্রচুর প্রামাণ্য দলিল রয়েছে, তাই বইটি নভেরা আহমেদকে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে খুব জরুরি। তিনি বইটিতে শহীদ মিনারের মূল নকশার প্রতিলিপির একাংশ যুক্ত করেছেন। যেখানে দেখা যাচ্ছে, ১৯৫৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সরকারিভাবে নকশাটি পাস করা হয়। মূল নকশায় একটি অংশে লেখা ছিল ‘শহীদ মেমোরিয়াল: কম্পোজার হামিদুর রহমান, মুরিলিস্ট ইন কোলাবোরেশন উইথ নভেরা আহমেদ স্কাল্পচারার, জিন ডেলিউরান, আর্কিটেক্ট, সি অ্যান্ড বি ডিপার্টমেন্ট’।

তথ্যচিত্র নির্মাতা ভিভিয়ান ভাগের কাছে ২০১৪ সালে প্যারিসে বসে তাঁর শেষ সাক্ষাৎকারে নভেরা শহীদ মিনার প্রসঙ্গে বলেন, ‘সরকারি লোকজন যোগাযোগ করেছে, আমি তাদের আইডিয়ার কথা বলেছি। কী করতে হবে বলেছি। আমাকে অগ্রিম কিছু অর্থ দিতে হবে। তারা দিয়েছে আমাকে।...অনেক কাজ একা করতে হবে বলে হামিদকে বলি সাহায্যের জন্য।’ শহীদ মিনারের তিনটি ফিগারের মানে কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বুদ্ধা ইন্টারেস্টস মি এ লট, আই নিড ব্লেসিং।’

নভেরার বদ্ধমূল ধারণা ছিল বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে ভুলে গেছে। তাই ঢাকায় আসার ইচ্ছে প্রকাশ করেই আবার দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়তেন। তবু তাঁর দেশে ফেরার ব্যাকুলতা ছিল। শহীদ মিনারের সামনে হুইলচেয়ারে বসে ছবি আঁকার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শরীর অত্যন্ত খারাপ হয়ে যাওয়ায় দেশে ফেরা হয়নি তাঁর। ২০১৫ 
সালের ৫ মে এক বুক অনুচ্চারিত অভিমান নিয়ে তিনি মারা যান। 

লেখক: আফরিন শাহনাজ

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন

রোজা রেখে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে কি?

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস