হোম > ছাপা সংস্করণ

যার নাই কোনো গতি

মো. তায়্যিব উল ইসলাম সৌরভ

যার নাই কোনো গতি,  সে করে ওকালতি—এ প্রবাদটির সঙ্গে পরিচিত নয়, এমন লোক পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। কথাটি বলা হয় আইনজীবীদের একপ্রকার উপহাস করেই। আমার ধারণা, বেশির ভাগ আইনজীবীর ক্ষেত্রেই প্রাথমিকভাবে একটু-আধটু মন খারাপের কারণ হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবাদটি তাঁদের আর এতটা খারাপ লাগে না। কেন লাগে না, সেটাই বলার চেষ্টা করব এখানে।

চলুন, প্রথমেই সংক্ষেপে আইনজীবী হওয়ার প্রক্রিয়াটা একটু দেখে নিই। এ প্রক্রিয়াটা আমাদের দেশে যতটা সহজ বলে লোকে মনে করে, আসলে ঠিক ততটাও সহজ নয়। ধরুন, আপনি আইনজীবী হতে চান, তাহলে প্রথমেই আপনাকে আইনের একটা ডিগ্রি নিতে হবে, তিন-চার বছরের এলএলবি ডিগ্রি। ডিগ্রি নেওয়ার পর আপনাকে কমপক্ষে ছয় মাস একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর অধীনে কাজ করতে হবে এবং আপনি যে ছয় মাস কাজ করেছেন, সেই কাজের ফিরিস্তিসহ আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করতে হবে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে। এরপর বার কাউন্সিল একটা বহুনির্বাচনি নৈমিত্তিক পরীক্ষা নেবে, সেখানে উত্তীর্ণ হলে আপনাকে বসতে হবে লিখিত পরীক্ষায়। লিখিত পরীক্ষার পর আপনাকে মুখোমুখি হতে হবে একটা মৌখিক পরীক্ষার। বলে রাখা ভালো, নৈর্ব্যক্তিক আর লিখিত পরীক্ষায় পাস করে যাঁরা মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন, তাঁদের প্রায় অর্ধেকই এই অংশটা পার হতে পারেন না। আইনের ডিগ্রি নেওয়ার পর প্রায় দুই বছর ধরে আপনাকে এ রকম একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং সব ধাপ সাফল্যের সঙ্গে পার হলেই কেবল আপনার নামটা আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে। পুরো প্রক্রিয়া একেবারেই সংক্ষেপে বলার কারণ, এর বিস্তারিত লিখতে হলে সিরিজ করে লেখা লাগবে, তাই আপাতত এটুকুতেই থামা ভালো।

২. 
আপনি যখন আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন, তখন নিম্ন আদালতে আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনার অনুমতি পেলেন। এই পর্যায়ে যদি আপনার মনে হয় যে আমি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হব, তখন আপনাকে পুনরায় আরেকটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে এক থেকে দুই বছর নিম্ন আদালতে ওকালতি করার পরই আপনি সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করতে পারবেন। এখানেও আবেদন ফরমে আপনাকে সুপ্রিম কোর্টের একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর অধীনে কাজ করার অভিজ্ঞতার ফিরিস্তি দিতে হবে, আবারও একটা লিখিত পরীক্ষা দিতে হবে এবং সবশেষে আপনাকে আবার আরেকটা মৌখিক পরীক্ষায় বসতে হবে। মোটকথা, আইনের ডিগ্রি লাভের পর বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তি থেকে শুরু করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অনুমতি পেতে একজন ভাগ্যবান মানুষের কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগবে, মন্দ কপাল হলে ৫ থেকে শুরু করে ১০ বছর।
 অনেকেই জেনে অবাক হতে পারেন, আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির পরীক্ষায় প্রাথমিক পর্যায়ে মোট যতজন পরীক্ষার্থী অংশ নেন, তাঁদের মধ্যে মাত্র ১৫ থেকে ২০ ভাগ পরীক্ষার্থীই শেষ পর্যন্ত আইনজীবী হিসেবে নিজেদের নাম খুঁজে পান। মজার ব্যাপার হলো, অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর তালিকায় দুনিয়ার বিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে আসা শিক্ষার্থীর যেমন অভাব নেই, তেমনি নিতান্তই সাধারণ ছাত্রেরও তরতর করে এই লম্বা পথ পাড়ি দেওয়ার নজিরও আছে দেদার।

যাঁরা ভাবছেন, এত এত পরীক্ষা-টরীক্ষা দিলেই কি, পাস করলেই তো সব ঝামেলা শেষ; তাঁদের জন্য বলছি, এই যে এত এত পরীক্ষা আর দৌড়াদৌড়ি, এর একটাই মাত্র ফল–আইনজীবী হিসেবে নিজের নাম অন্তর্ভুক্তিকরণ। এর পর থেকে শুরু হবে আপনার আসল পরীক্ষা, কঠিনতর এবং বাস্তবিক পরীক্ষা। এখানে প্রতিদিন আপনাকে দিতে হবে যোগ্যতার প্রমাণ। একেকটা নতুন মামলা, একেকটা পরীক্ষার মতোই মনে হবে। ডজন ডজন বই ঘেঁটেঘুঁটে মামলা দাঁড় করানো লাগবে, নজির জোগাড় করা লাগবে, যুক্তি খণ্ডাতে হবে আপনার বিপরীত পক্ষের আইনজীবী সহকর্মীর। নবীন হোন কিংবা প্রবীণ, বেশির ভাগ আইনজীবীরই কিন্তু কর্মঘণ্টা প্রায় ১০ বা এরও বেশি। দৈনিক ১৪ ঘণ্টা কাজ করেন, এমন আইনজীবীর অভাব নেই দেশে।

৩. 
এবার ভাবুন তো, কেন একজন মানুষ শুধু শুধু এত এত পরীক্ষা দিয়ে, এত এত সময় নষ্ট করে, কোনো ধরনের ‘অটোমেটিক’ বেতনহীন, দৈনিক ১০-১২ ঘণ্টার একটা পেশায় আসবেন? ভাবার মতো একটা প্রশ্নই বটে, মাথা চুলকানো টাইপ। উত্তরটা তবে আমিই বলে দিচ্ছি, এর কারণ ওই একটাই ‘যার নাই কোনো গতি, সে করে ওকালতি’। এত কাঠখড় পুড়িয়ে যিনি একবার আইনজীবী বা উকিল হন, তাঁর আর অন্য পেশায় যাওয়ার সময়, ধৈর্য বা ইচ্ছা কোনোটাই প্রায় থাকে না। তা ছাড়া, এত দিন কাঠখড় পোড়াতে পোড়াতে এর গন্ধটাও কেমন আপন আপন লাগা শুরু হয়, অন্য জগতের সুর, তা যতই মধুর হোক উকিলের কানে আর ঢোকে না বা হয়তো ঢুকতে পারে না।

আরও একটু সহজ করে বলি। আমরা যারা ওকালতি করতে আসি, তাদের প্রায় সবারই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থা থেকেই আইনজীবী হওয়ারই ইচ্ছা থাকে। দিন কাটে অপেক্ষায়, চোখে থাকে কোর্টে যাওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই অপেক্ষা ফুরাতে সময় গড়িয়ে যায় অনেক। আবার অপেক্ষাটাও করতে হয় কোর্টের বারান্দায় হেঁটে, চেম্বারে খেটে, মামলার ফাইল-বই ঘেঁটে। তারপর যখন অপেক্ষা ফুরায়, তখন আসলেই আর এ কাজ ছাড়া গতি থাকে না। তত দিনে কোর্টকেন্দ্রিক একটা আলাদা জীবন গড়ে ওঠে সবারই।

তবে আইন পেশায় থেকেও যে অনেক গতি করা যায় এবং প্রায়ই তা নিজের দেশ, জাতি তো বটেই, পুরো বিশ্বেরও গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করা যায়, সেটাও কিন্তু মিথ্যা না। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী থেকে শুরু করে নেলসন ম্যান্ডেলা, মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহরু, মার্গারেট থ্যাচার, বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা, এমনকি বর্তমানে আমেরিকার জো বাইডেন আর রাশিয়ার পুতিনসহ অনেক বড় বড় রাজনীতিকই ওকালতিতে সময় ব্যয় করেছেন। আমাদের বঙ্গবন্ধুও কিন্তু আইনেরই ছাত্র।

শেষে একটা মজার তথ্য দিই, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে যত প্রেসিডেন্ট এসেছেন, তাঁদের মধ্যে মাত্র ২০ জনের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি আছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উচ্চশিক্ষিত আমেরিকান এই ২০ প্রেসিডেন্টের মধ্যে ১৫ জনই কিন্তু আইনের ছাত্র।

মো. তায়্যিব-উল-ইসলাম সৌরভ,  আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন

রোজা রেখে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে কি?

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস