এই তো দিন কয়েক আগের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বারান্দা থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করলেন। বিষয়টি প্রেমঘটিত কি না, এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এর ঠিক দিন দশেক আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী পরীক্ষার চাপ সহ্য করতে না পেরে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে বেছে নিয়েছিলেন মুক্তির পথ।
এরও মাসখানেক আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী চাকরি না পাওয়ার হতাশায় ডুবে আত্মহত্যা করলেন। আত্মহত্যার এ যাত্রা যেন মহামারি আকার ধারণ করেছে। যে যাত্রায় প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন যাত্রী। তবে কেন স্বেচ্ছায় এ অকালযাত্রা, এর কোনো উত্তর কি আছে?
উন্নত প্রযুক্তির উন্নয়নের শিখরে বিশ্ব। অজানাকে জানার রহস্যে মানুষ এখন অনেক এগিয়ে। পৃথিবী এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। চাইলেই মুহূর্তে ঘুরে আসা যায় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। মানুষ এখন চাঁদের মাটিতে পৌঁছে গেছে। প্রতিনিয়ত প্রকাশ হচ্ছে মহাকাশ, সৌরজগৎ, গ্রহ-নক্ষত্রের নতুন নতুন চিত্র। আকাশচুম্বী এভারেস্ট এখন মানুষের পদতলে। চাইলেই ছুঁয়ে দেখা যায় বিশ্বকে কিংবা হতবাক করা টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ। পাড়ি দেওয়া যায় জনমানবহীন বরফে ঢাকা মহাদেশ আটলান্টিকে। নতুন করে আবিষ্কৃত হচ্ছে মহাদেশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা রোবট কিংবা নতুন নতুন আবিষ্কারে জীবন হয়েছে সহজ। পৃথিবী ছাড়িয়ে মানুষ আজ মহাবিশ্বের দ্বারপ্রান্তে।
শুধু কি তাই? সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমাদের আজ হাজার হাজার বন্ধু। বেড়েছে বিনোদনের নতুন নতুন মাধ্যম। যোগাযোগব্যবস্থা হয়েছে সহজলভ্য। যেকোনো সময় চাইলেই নিজেকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা যাচ্ছে।
নতুনত্বে ডুব দিলেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা আজও উদাসীন। নয়তো এত কিছুর পরও কেন এই বিষণ্নতা? যার দরুন পৃথিবী ছাড়ার এই প্রতিযোগিতা! বিষণ্নতাই যদি মৃত্যুর কারণ হয়, তবে কী এই বিষণ্নতা? শুধুই কি মন খারাপ? আধুনিকতায় আমরা প্রতিনিয়ত ‘মন খারাপ’ বিষয়টি হেলায় উড়িয়ে দিতে পারি। আমরা জানি না মন খারাপ আর বিষণ্নতার (ডিপ্রেশন) পার্থক্য কী?
মন খারাপ মানেই বিষণ্নতা নয়। কিন্তু একটানা ১৫ দিনের বেশি মন খারাপ থাকা, পছন্দের কাজ করতে অনীহা, কোনো কিছু করতেই ভালো না লাগা, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, ধীরে ধীরে নিজেকে অসহ্য লাগার যে বিষয়টি, তা আর নিছক মন খারাপ নয়। এ রকম পরিস্থিতিতে মানুষ নিজের জীবনের প্রতি এতটাই বিরক্ত থাকে যে ওই মুহূর্তে আত্মহত্যাকে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে হয়।
বিষণ্নতার কারণ হিসেবে আমরা পারিবারিক সমস্যা, পড়াশোনার চাপ, বেকারত্ব, প্রেমঘটিত সমস্যা, মাদকাসক্তের মতো বিষয়গুলো
চিহ্নিত করে থাকি।
কিন্তু আত্মহত্যার কারণ কি শুধুই বিষণ্নতা? অবশ্যই না। দিন-রাত্রির আবর্তন যেমন স্বাভাবিক, বিষণ্নতাও ঠিক ততটাই স্বাভাবিক। এর জন্য রয়েছে চিকিৎসা। চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ উন্নত। শারীরিক অসুস্থতায় আমরা যতটা বিচলিত হই, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ততটা ভেবেও দেখি না। ফলস্বরূপ না আমরা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানীর শরণাপন্ন হই, না আমাদের পর্যাপ্তসংখ্যক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানী আছে। আমরা এখনো মনে করি, সাইকোলজিস্ট মানে পাগলের ডাক্তার। তাই বিষণ্নতা সমাধানের জন্য নিজেকে পাগল প্রমাণ করতে আমরা নারাজ।
বলার অপেক্ষা রাখে না—বিষণ্নতায় ভুগে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রতি অনীহা প্রকাশ।মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান খুবই সামান্য। এর ভয়াবহতা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজ খুললেই অনুভব করতে পারছি। তবে আমরা আজও সচেতন হতে পারিনি। অগত্যা প্রতিনিয়ত শামিল হয়ে চলেছি বিষণ্নতা মহামারির এ যাত্রায়।
বিশ্ব আজ মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালন করছে। এটি কাগজ-কলমের মাধ্যমে দিবসেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি প্রাত্যহিক জীবনে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে মানুষ সচেতন হবে, সেটিই দেখার।
লেখক: সংবাদিক