প্রায় আড়াই দশক আগের গল্প। গাড়ি চালানো শেখার প্রথম দিন ওস্তাদ স্টিয়ারিং ধরিয়ে দিয়ে প্রথম শিক্ষাটা দিলেন, ‘বুচ্ছেন মামা, রাস্তায় আপনি ছাড়া বাকি সব ড্রাইভার পাগল। আপনি একলা খালি গাড়ি ভালো চালাইলে অইব না। পাগল থাইকা বাইচ্চা থাকতে অইব।’ বাংলাদেশের রাস্তা যখন পুরোই পাগলা ষাঁড়ের বাথান, তখন এত দিন পরেও এ বাণী ভোলার নয়।
রাস্তার এই পাগলদের সামলাতে দুনিয়ার সব জায়গায় ‘ট্রাফিক ব্যবস্থা’ আর ‘ট্রাফিক আইন’ বলে দুটি বিষয় থাকে। বলা হয়ে থাকে, একটি দেশের বা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা আর গণপরিবহন সে দেশের সভ্যতা ও উন্নয়নের শোকেস। নতুন কোথাও গিয়ে, নাগরিকদের শিক্ষা, স্বভাব-সভ্যতা কিংবা তাদের পার্থিব সাফল্যের ধারণা পেতে ঘরে ঘরে জরিপ করার কিংবা মোটা মোটা রিপোর্ট পড়ার প্রয়োজন নেই। ঘণ্টা কয়েক রাস্তায় রাস্তায় ঘুরলেই হয়।
ঢাকার রাস্তার হাজার হাজার পাগলা ষাঁড়ের একটি সম্প্রতি এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। মোটরসাইকেল আরোহী এক নারীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে প্রায় এক কিলোমিটার টেনে নিয়েছে গাড়ির চাকায়। কোনো স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে এমন হত্যা মেনে নেওয়া অসম্ভব।
কিন্তু আমরা, যারা ঢাকায় থাকি, খবর-টবর দেখি, তারা সম্ভবত স্বাভাবিক নই, অতিমানব। আমরা দিব্যি খবর দেখেছি, ভিডিও দেখে চালক, যিনি কিনা আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিচ্যুত শিক্ষক, তাঁর সম্পর্কে (এবং সুযোগ পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে) দুটো মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে দিয়ে, আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল কমেন্ট-যুদ্ধে নেমে পড়েছি। পুলিশ ভাইয়েরা তাঁদের কাজ করেছেন—মামলা হয়েছে। এখন মামলা চলবে। চলুক!
এদিকে রাস্তায় কিন্তু হাজার হাজার পাগলা ষাঁড় এখনো স্টিয়ারিং ধরে আছে। তাদের কে, কীভাবে থামাবেন? আমরা এসব নিয়ে ভাবি না।এসব মহাত্মাদের ভাবনা, ভেবে ভেবে তাঁরা নির্ঘুম রাত কাটান। স্ত্রী-পরিজনদের বিদেশে রেখে, কেবলমাত্র আমাদের ভাবনা ভাবতেই মহাত্মারা এ দেশে পড়ে আছেন।
এ বছরের চূড়ান্ত হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, ৫ হাজার ৬২৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৭ হাজার ৮০৯ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৯ হাজার ৩৯ জন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের করা গবেষণা অনুযায়ী, এসব সড়ক দুর্ঘটনার ৫৩ শতাংশ ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে; ৩৭ শতাংশ চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে এবং বাকি ১০ শতাংশ গাড়ির ত্রুটি ও পরিবেশের কারণে। এ তো গেল হতাহতের পরিসংখ্যান। কিন্তু উচ্ছৃঙ্খল-বিশৃঙ্খল, অব্যবস্থাপনার ফলে সৃষ্ট ট্রাফিক জ্যাম কত হাজার কোটি টাকার জ্বালানি আর শ্রমঘণ্টা খেয়ে নিচ্ছে, তার হিসাব ২০১৫ সালের পর কি হয়েছে, তা কারও জানা নেই। সে বছর বিনিয়োগ বোর্ডের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির ৭ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে শুধু ঢাকা শহরের যানজটের কারণে। ঢাকার যানজটের কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে ১ হাজার ২৫৬ কোটি মার্কিন ডলার। শুধু এই শহরকে যানজটমুক্ত করা গেলে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বাড়ত ৭৮ ডলার বা ৬ হাজার ২৮০ টাকা। যানজটের কারণে এত আর্থিক ক্ষতি বিশ্বের আর কোনো দেশে হয় না। শুধু যানজট দূর করা গেলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতো ১৩ শতাংশ।
আজ এই মধ্য বয়সে, আমার শৈশব-কৈশোরের ভালোবাসার ঢাকায় দাঁড়িয়ে ভাবি, পুরস্কারটা আমি কাকে দেব? ঢাকার ড্রাইভার সম্প্রদায়কে, নাকি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ট্রাফিক বিভাগকে? ৩০ লাখ যান চলাচল করে যে শহরে, সেখানে ট্রাফিক সিগন্যাল নেই! ওই যে লাল, হলুদ, সবুজ বাতি জ্বলে ট্রাফিক সিগন্যালে, সেটা ডায়াবেটিক সমিতির লোগো ছাড়া ঢাকার আর কোথাও পাবেন না। এই শহরে যে ‘চাক্কা ঘোরে’ এটি অবধারিতভাবে ‘সারা বিশ্বের বিস্ময়, আমার অহংকার’। আমরা মানি আর না-ই মানি।
জ্যামে বসে রিকশাওয়ালার সঙ্গে ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে ‘টক শো’ করছিলাম। বললাম, ‘আপনারা যাঁরা ঢাকায় রিকশা বা গাড়ি চালান, তাঁরা কোনো আইনকানুন মানেন না।’ স্মার্ট-ডিজিটাল চালক জবাব দিলেন, ‘আইন মানব না মানে? লেখেন তো একটা কিছু ফেসবুকে? আপনারে সাত হাত মাটির তল থাইকা খুইজ্জা বাইর কইরা আইন শিখাইব।’ ডিজিটাল আইন তো সবাই মানে দেখি। আমি লাজবাব। পরে অবশ্য খোঁজখবর নিয়ে দেখলাম, রিকশাওয়ালার ধারণাটা ঠিক নয়। আমাদের ট্রাফিক সার্জেন্টরা ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রচুর মামলা দেন। ২০২১ সালে সারা দেশে মোটরযান আইনে মামলা হয়েছে ৭ লাখ ২০ হাজার ৮৯৩টি। আর এসব মামলার জরিমানা থেকে সরকারের কোষাগারে জমা হয়েছে ১৫৪ কোটি ১৫ লাখ ১১ হাজার ৪৮৮ টাকা। অবশ্য সরকারি কোষাগারে জমা হওয়া এই অঙ্কের অর্ধেক, অর্থাৎ আরও প্রায় ৮৭ কোটি টাকা বছরে চাঁদাবাজি হয় সড়ক-মহাসড়কে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের মহাসড়কে চাঁদাবাজির এ তথ্য সংগ্রহ করেছে হাইওয়ে পুলিশ। অবশ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিকনেতারা বলছেন, এই চাঁদার একটা বড় অংশ দিয়ে দিতে হয় পুলিশকে!
যাহোক, এসব তথ্য-উপাত্ত নতুন কিছু নয়। এসবই সবার জানা। আপনাদের বরং সম্প্রতি আমার দুই বন্ধুর দুটি মামলা খাওয়ার গল্প বলি।তাঁদের একজন মামলা খেয়েছেন এই ঢাকা শহরে ‘অতিরিক্ত গতিতে’ গাড়ি চালানোর জন্য। অন্যজন ‘ইউটার্ন’ নিয়ে। বললাম, নিশ্চয়ই মামলা খাওয়ার কাজ করেছেন। তাঁরা বললেন, ‘নারে ভাই, অত সাহস আমাদের নেই। সামনের পাঁচ-সাতটা গাড়ি একই স্পিডে গেল কিংবা একই জায়গায় ইউটার্ন নিল, তারা কেউ মামলা খেল না। আমরা পড়ে গেলাম মামলার ফেরে। আসলে আমাদের সার্জেন্ট ভাইয়েরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছোটবেলায় শেখা ‘ওপেন্টি বায়োস্কোপ, নাইন-টেন-টেইস্কোপ...’ ছড়াটি আওড়াতে থাকেন। যার ‘গলায় মুক্তার মালা’ পড়ে যায়, তাকেই কেবল তাঁরা মামলা দেন।’
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাস, মিনিবাস, টেম্পো, কিংবা ‘সমিতি’তে নিবন্ধিত যানের ‘গলায় মুক্তার মালা’ পড়ে খুবই কম—প্রায় ‘না’ বললেই চলে। অবশ্য ভিন্ন সূত্র বলে, সার্জেন্টদের নাকি মামলা করার মাসিক টার্গেট থাকে। সেই টার্গেট পূরণের জন্য পাওয়া যায় পয়েন্ট ও প্রশংসা। তাই মাসের শেষের দিকে মামলার সংখ্যা বেড়ে যায়।
অনিরাপদ সড়ক, বিশৃঙ্খল রাস্তার অব্যবস্থাপনা নিয়ে এই যে আমরা নির্ভাবনায় থাকি, এমনটা কিন্তু আগে ছিল না। এই মাত্র চার বছর আগে, ২০১৮ সালেও আমাদের ছেলেমেয়েরা রাস্তায় নেমেছিল নিরাপদ সড়কের দাবিতে। দাবি আদায়ের আন্দোলনের এক অভূতপূর্ব রূপ আমরা শিখেছিলাম ‘জেনারেশন জেড’-দের কাছে। তারা লাইসেন্স না থাকায় ও ট্রাফিক আইন ভঙ্গের কারণে বাণিজ্যমন্ত্রী, পানিসম্পদমন্ত্রী, রেলমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিচারক, পুলিশের ডিআইজি কাউকে ছাড় দেয়নি। মাত্র সাত দিনে তারা দেখিয়ে দিয়েছিল, সম্ভব। চাইলেই সম্ভব সড়ককে নিরাপদ করা, ঢাকাকে বাসযোগ্য করা। কিন্তু এমনটা করলে তো আর আয়-রোজগার হবে না। তাই, ছলে-বলে-কৌশলে শিক্ষার্থীদের আমরা কেবল ক্লাসেই ফেরত পাঠাইনি, তাদের দেওয়া সব শিক্ষা, তাদের দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি আমরা খুবই যত্নের সঙ্গে কবর দিয়েছি।
সে সময়, মানে ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে সড়কে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৭টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। আমাদের বে-বুঝ মন বারবার জানতে চায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সেসব নির্দেশাবলির বাস্তবায়ন কিংবা বাস্তবায়নের মনিটরিং কার দায়িত্ব? আচ্ছা, এ প্রশ্নটাই বা আমরা কাকে জিজ্ঞাসিব?
সর্বশেষ, আপনারা কি ঢাকার রাস্তায় হেলিকপ্টার দেখেছেন? হ্যাঁ, প্রযুক্তির সফল উন্নয়নে আমাদের রিকশাগুলো সব এখন ঢাকার রাস্তায় উড়ে উড়ে চলে। ঢাকার রাস্তায় বিশৃঙ্খল-অব্যবস্থাপনার নব সংযোজন হলো ‘ব্যাটারি রিকশা’। অলিগলিতে এরা উড়ে বেড়ায় ‘দুরন্ত গতিতে’। কেউ দেখার নেই, কারও কোনো দায়িত্ব নেই। আর আমাদেরও ‘কোথাও যাওয়ার নেই, কিচ্ছু করার নেই।’
লেখক: মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ