প্রেম ও সঙ্গীর খোঁজে মানুষের দীর্ঘ যাত্রার অনেক গল্প আছে। তবে এই গল্পটি আফ্রিকার তিন বন্য কুকুরের প্রায় ২ হাজার ৫৬৩ মাইল পথ পাড়ি দেওয়ার। এই কাহিনি একই সঙ্গে রোমাঞ্চকর ও হৃদয়বিদারক। সঙ্গীর সন্ধানে জাম্বিয়ার কাফুয়ে ন্যাশনাল পার্ক থেকে বেরিয়ে পড়া তিন ভাইয়ের এই যাত্রা আফ্রিকা মহাদেশে কোনো প্রাণীর নথিভুক্ত দীর্ঘতম একক স্থলযাত্রার রেকর্ড গড়েছে।
সিএনএন জানায়, ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট তিন বছর বয়সী তিন পুরুষ আফ্রিকান বন্য কুকুর জাম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের কাফুয়ে ন্যাশনাল পার্কের মায়ুকুয়ুকু প্যাক বা দল ছেড়ে যায়। ৯ মাসেরও কম সময়ে তারা কুমিরে ভরা নদী পেরিয়ে, সিংহ ও মানুষের ঝুঁকি এড়িয়ে শহরাঞ্চলের পাশ দিয়েও এগিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের এপ্রিলে তাদের যাত্রা পূর্ব জাম্বিয়ার লুয়াংওয়া উপত্যকার একটি বনাঞ্চলে গিয়ে থামে।
তাদের গতিবিধি স্যাটেলাইট জিপিএস কলারের মাধ্যমে অনুসরণ করছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা স্টেট ইউনিভার্সিটির সংরক্ষণ জীববিজ্ঞান ও প্রতিবেশবিদ্যার অধ্যাপক স্কট ক্রিল। জাম্বিয়ান কার্নিভোর প্রোগ্রামের সঙ্গে যৌথভাবে গত ১৬ বছরে তিনি ৫০ টির বেশি প্যাকের ৫০০-এর বেশি বন্য কুকুরের চলাচল পর্যবেক্ষণ করেছেন।
ক্রিলের মতে, বন্য কুকুরদের একটি প্যাকের মধ্যে সাধারণত প্রজননের সুযোগ সীমিত। ফলে তরুণ প্রাণীদের সামনে দুটি পথ থাকে—প্যাকে থেকে নেতৃত্বের সুযোগের অপেক্ষা করা অথবা নতুন সঙ্গীর সন্ধানে বেরিয়ে পড়া। মায়ুকুয়ুকু প্যাকের তিন ভাই দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয়।
যাত্রার শুরুতেই তারা জাম্বিয়ার প্রধান শহরগুলোর দিকে এগিয়ে যায়। সংরক্ষিত এলাকা ছেড়ে মানুষের বসতি বাড়তে থাকা অঞ্চলে ঢোকার পর তাদের চলাচলের ধরনও বদলে যায়। গবেষকেরা একে ‘ট্রাভেল মোড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিন ভাইয়ের কাজ ছিল বিশ্রাম, শিকার ও চলাচলের স্বাভাবিক ভারসাম্যের বদলে বিপদ এড়িয়ে দ্রুত সরল পথে এগিয়ে যাওয়া।
এ মাসেরও বেশি সময় পর গত বছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্রায় ৭৫০ মাইল পথ পাড়ি দেওয়ার পর তিন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় তাদের তিন বোনের। যদিও তাদের বোন ছিল চারটি। এর মধ্যে একটি যাত্রাপথেই প্রাণ হারায়। তিন ভাই রওনা হওয়ার দুই সপ্তাহ আগেই বেরিয়ে পড়েছিল চার বোন। গন্ধ অনুসরণ করে এত দূরে একে অপরকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা বন্য কুকুরদের সামাজিক বন্ধনের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। বোনদের কাছ থেকে অবশ্য তারা আবারও আলাদা হয়ে যায়। এক বোন আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে যায় মোজাম্বিকের দিকে।
পরবর্তী ছয় মাসে তিন ভাই পশ্চিমমুখী আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে পূর্ব জাম্বিয়ার লুয়াংওয়া উপত্যকায় পৌঁছায়। সেখানে আফ্রিকার অন্যতম বড় বন্য কুকুরের আবাস রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, সেখানে তারা বন্য স্ত্রী কুকুরের সঙ্গে মিলিত হতে পেরেছিল। তবে দুর্গম এলাকার কারণে তা নিশ্চিতভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এই দীর্ঘ যাত্রা সংরক্ষণবিদদের জন্য আশারও খবর। বিভিন্ন প্যাক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বন্য কুকুরের চলাচল জাম্বিয়ার সাতটি জাতীয় উদ্যানের বিচ্ছিন্ন জনসংখ্যার মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করেছে। এমনকি তাদের চলাচল জাম্বিয়ার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে—কেউ মোজাম্বিক, কেউ ডিআর কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও মালাউইয়ের দিকে গেছে।
তবে এই গল্পের অন্য দিকটি ভয়াবহ। যে তিন বোনের সঙ্গে ভাইদের দেখা হয়েছিল তাদের একজন জঙ্গলে শিকারিদের পাতা তারের ফাঁদে আটকা পড়ে মারা যায়। পরে তার জিপিএস কলারটি ছুরি দিয়ে কেটে নেওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়। আরেক বোনেরও মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তৃতীয়টির ভাগ্যে কী ঘটেছে তা এখনো অজানা।
বন্য কুকুর ধরার জন্য এসব ফাঁদ পাতা হয় না; মূলত মাংসের জন্য হরিণ, জেব্রা বা অন্যান্য বড় তৃণভোজী প্রাণী শিকার করতেই এগুলো ব্যবহার করে চোরাশিকারিরা। কিন্তু ফাঁদে আটকে মারা যায় বন্য কুকুর, সিংহসহ অন্যান্য প্রাণীও।
ক্রিলের মতে, চোরাশিকারের কারণে বড় তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলে বন্য কুকুরকে খাবারের সন্ধানে আরও দূরে যেতে হয়। এতে তাদের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
আফ্রিকান বন্য কুকুর এখন বিপন্ন। বিশ্বে ৭০০ টিরও কম প্যাক এবং ১ হাজার ৭০০-এর কম প্রাপ্তবয়স্ক প্রাণী অবশিষ্ট আছে বলে জানিয়েছে আইইউসিএন। ক্রিলের জানান, বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে এদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন। আর সংযোগ রক্ষা করতে না পারলে একসময় রক্ষা করার মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।